কলকাতার মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা: উত্তর দিনাজপুরের বিতর্কিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পুজোমণ্ডপগুলিতে অবিলম্বে নিরাপত্তা পরিদর্শনের দাবি

তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ | ১৮ অক্টোবর১৯ জন সহনাগরিকের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনা যেন আর কোনও পরিবারকে শোকের অন্ধকারে ঠেলে না দেয়। দুর্গোৎসবের আনন্দের মাঝেই উঠে আসছে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কলকাতার চোরবাগানের দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে উত্তর দিনাজপুর জেলার সমস্ত পুজোমণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি উঠছে।বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গোৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে থাকে আবেগ, আনন্দ, ভালোবাসা এবং মিলনমেলার পরিবেশ। সারা বছর অপেক্ষার পর দুর্গাপুজোর কয়েকটি দিন মানুষ পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দর্শন করতে চান। কিন্তু সেই আনন্দের উৎসবেই যদি কোনও দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে মুহূর্তের মধ্যে একাধিক পরিবারের জীবনে নেমে আসতে পারে গভীর শোকের ছায়া। কলকাতার চোরবাগানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সেই আশঙ্কাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।এই পরিস্থিতিতে উত্তর দিনাজপুর জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির কাছে আবেদন, জেলার প্রতিটি পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও একবার খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হোক। বিশেষ করে যেসব মণ্ডপের নির্মাণশৈলী, প্রবেশপথ, বেরোনোর রাস্তা কিংবা দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন বা উদ্বেগ রয়েছে, সেগুলিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পরিদর্শন করা জরুরি।

নজরকাড়া থিমের পাশাপাশি নিরাপত্তাও হোক পুজোর প্রধান আকর্ষণ

বর্তমানে দুর্গাপুজো মানেই অভিনব থিম, দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা, বিশাল মণ্ডপ এবং দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন পুজো কমিটি নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি কোনওভাবেই উপেক্ষিত হওয়া উচিত নয়।একটি মণ্ডপ যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, সেখানে দর্শনার্থীদের নিরাপদে প্রবেশ ও বেরিয়ে আসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি। মণ্ডপের ভিতরে ও বাইরে চলাচলের পথ, জরুরি নির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা দরকার। কোথাও কোনও ত্রুটি ধরা পড়লে তা দ্রুত সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনরায় পরিদর্শন করা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

 

মহাষ্টমীর ভিড় সামলাতে আগাম প্রস্তুতি জরুরি

দুর্গাপুজোর দিনগুলির মধ্যে মহাষ্টমীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তিথিতে দর্শনার্থীদের ভিড় অনেক বেড়ে যায়। প্রতিমা দর্শনের আবেগে মানুষ অনেক সময় ভিড়ের চাপ, চলাচলের অসুবিধা কিংবা সম্ভাব্য বিপদের বিষয়টি বুঝে উঠতে পারেন না। ফলে সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।তাই উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ, ইসলামপুর, কালিয়াগঞ্জ-সহ বিভিন্ন শহর ও এলাকার পুজোমণ্ডপগুলিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত পুলিশকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন, প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ আলাদা রাখা, জরুরি পরিষেবার গাড়ি চলাচলের রাস্তা সচল রাখা এবং প্রয়োজনে দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।বিশেষ করে যেসব মণ্ডপে অভিনব নির্মাণশৈলী বা জটিল কাঠামো রয়েছে, সেখানে কাঠামোগত নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত দর্শনার্থীদের বের করে আনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনও মণ্ডপে নিরাপত্তার ঘাটতি ধরা পড়লে দর্শনার্থীদের স্বার্থে দ্রুত সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 

প্রশাসনের তৎপরতাই পারে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে

দুর্গোৎসব নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে পুজো কমিটি, প্রশাসন, পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত ভূমিকা রয়েছে। পুজো কমিটিগুলিকে যেমন নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে, তেমনই প্রশাসনকেও নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় নির্দেশ কার্যকর করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।শুধু উদ্বোধনের আগে একবার মণ্ডপ পরিদর্শন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির উপর নজর রাখা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি বজায় রাখা এবং কোনও সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও থাকা দরকার।উত্তর দিনাজপুরের প্রতিটি দর্শনার্থী যাতে নিশ্চিন্তে প্রতিমা দর্শন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই প্রশাসনের কাছে আগাম ও কার্যকর নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন জানানো হচ্ছে।

 

আনন্দের উৎসব যেন কারও জীবনে বিপর্যয় ডেকে না আনে

কলকাতার মর্মান্তিক দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মানুষের জীবনের নিরাপত্তার কোনও তুলনা হয় না। কোনও পুজোমণ্ডপের জনপ্রিয়তা, সৌন্দর্য কিংবা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করার ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেখানে আসা প্রতিটি মানুষের নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়া।তাই উত্তর দিনাজপুর জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে আবেদন, জেলার সমস্ত পুজোমণ্ডপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনরায় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। কালিয়াগঞ্জ-সহ জেলার সর্বত্র দুর্গোৎসবের বাকি দিনগুলি যেন আনন্দ, শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়।উৎসব হোক আনন্দের, প্রতিমা দর্শন হোক নির্বিঘ্নের—একটি অসতর্কতা যেন আর কোনও পরিবারের সারা জীবনের কান্নার কারণ না হয়ে ওঠে।