ধামাকা নয়, পরম্পরাই সবুজ সংঘের পরিচয়! ৪৪তম বর্ষে আলোর রোশনাইয়ে কালিয়াগঞ্জবাসীকে শ্যামাপুজোর বিশেষ উপহার

 তন্ময় চক্রবর্তী কালিয়াগঞ্জ, ২৬ অক্টোবর: শ্যামাপুজো   মানেই আলোর উৎসব, শক্তির আরাধনা আর উৎসবপ্রেমী মানুষের আনন্দে মেতে ওঠা। সেই উৎসবের আবহকে আরও বর্ণময় করে তুলতে প্রস্তুতি শুরু করে দিল কালিয়াগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সবুজ সংঘ ক্লাব। ৪৩ বছর পেরিয়ে এবার ৪৪তম বর্ষে পদার্পণ করতে চলেছে এই ক্লাবের শ্যামাপুজো। আর সেই পুজোকে ঘিরেই লক্ষ্মীপুজোর শুভ দিনে ক্লাব প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হলো খুঁটিপুজো। খুঁটিপুজোর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো এবারের শ্যামাপুজোর প্রস্তুতি।প্রতিবছরই কালিয়াগঞ্জের গণ্ডি পেরিয়ে উত্তর দিনাজপুর জেলার পুজোপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে সবুজ সংঘের শ্যামাপুজো। মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং সাবেকি প্রতিমার সমন্বয়ে এই পুজো ঘিরে মানুষের আগ্রহ থাকে যথেষ্ট।

 

তবে এবার ক্লাব কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে উঠে এল এক অন্য ভাবনা। তাঁদের কাছে পুজো মানেই শুধুমাত্র চমক সৃষ্টি করা কিংবা অন্য পুজোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামা নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা পুজোর পরম্পরাকে ধরে রাখা এবং কালিয়াগঞ্জবাসীকে আনন্দের কয়েকটি দিন উপহার দেওয়াই তাঁদের মূল লক্ষ্য।সবুজ সংঘ ক্লাবের অন্যতম সদস্য দেবব্রত কর জানান, তাঁদের পুজোর মূল ভিত্তি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও পরম্পরা।

সেই পরম্পরাকে সম্মান জানিয়েই প্রতিবছর তাঁরা শ্যামাপুজোর আয়োজন করে থাকেন।দেবব্রত করের কথায়, “আমরা কোনও ধামাকা দেওয়ার জন্য পুজো করি না। আমাদের একটা নিজস্ব পরম্পরা রয়েছে।

আমরা সেই পরম্পরাকে বহন করে আগামী দিনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।কালিয়াগঞ্জবাসী শক্তির আরাধনায় যেভাবে আমাদের পাশে থাকেন, তাতে আমরা অনুপ্রাণিত হই। পুজোর এই দু-তিনটি দিন মানুষের জীবনে আনন্দ ও বিনোদনের বিশেষ মুহূর্ত নিয়ে আসে। আমরা চাই, শক্তির আরাধনার পাশাপাশি কালিয়াগঞ্জবাসীকে সুন্দর কিছু মুহূর্ত উপহার দিতে।”

তিনি আরও বলেন, তাঁদের পুজোয় অভিনবত্ব দেখানোর জন্য আলাদা করে কোনও প্রতিযোগিতায় নামার মানসিকতা নেই। বরং যতটা সম্ভব সুন্দরভাবে পুজোর আয়োজন করাই তাঁদের উদ্দেশ্য। কালিয়াগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ও ভালোবাসাকে সঙ্গী করেই তাঁদের পুজো ক্রমশ এগিয়ে চলেছে।

 

দেবব্রত কর জানান, সবুজ সংঘের শ্যামাপুজো আজ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার পিছনে রয়েছে ক্লাবের সদস্যদের নিরলস পরিশ্রম এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা। পুজোর আয়োজনকে আরও সুন্দর করে তুলতে প্রতিবছরই ক্লাবের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকার বিভিন্ন স্তরের মানুষ এগিয়ে আসেন।তাঁর বক্তব্য, “আমাদের নির্দিষ্ট কোনও বাজেট থাকে না। ক্লাবের সদস্যদের সহযোগিতা এবং সর্বস্তরের মানুষের সাহায্য নিয়েই আমরা প্রতিবছর পুজোর আয়োজন করি। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।

 

মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতার কারণেই আমরা ৪৩ বছর অতিক্রম করে ৪৪তম বর্ষে পা রাখতে চলেছি। এই পুজো আমাদের একার নয়, কালিয়াগঞ্জের মানুষেরও পুজো।”ক্লাব কর্তৃপক্ষের মতে, পুজোর প্রকৃত সাফল্য শুধু মণ্ডপের আকার কিংবা আলোর জাঁকজমকে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখা এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে সম্মানের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

শ্যামাপুজোকে বলা হয় আলোর উৎসব। সেই আলোর উৎসবকে সামনে রেখেই এবার মণ্ডপসজ্জা ও আলোকসজ্জায় বিশেষ পরিকল্পনা করেছে সবুজ সংঘ। দেবব্রত কর জানান, এবারের পুজোয় মণ্ডপ ও আলোর রোশনাইয়ের মধ্যে নতুনত্বের ছোঁয়া তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। তাঁদের আশা, এই আয়োজন কালিয়াগঞ্জের পাশাপাশি সমগ্র উত্তর দিনাজপুর জেলার পুজোপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

এবার মণ্ডপসজ্জার দায়িত্বে রয়েছেন রতন সরকার। তাঁর বাড়ি দক্ষিণ দিনাজপুরের পতিরামে। মণ্ডপসজ্জার কাজে তাঁর অভিজ্ঞতা ও শিল্পভাবনাকে কাজে লাগিয়েই সবুজ সংঘের পুজোকে বিশেষ রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ক্লাব কর্তৃপক্ষের দাবি, কোচবিহারে তাঁর তৈরি মণ্ডপ ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে। ফলে এবার কালিয়াগঞ্জের সবুজ সংঘের মণ্ডপেও তাঁর শিল্পকর্ম দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করবে বলে আশাবাদী উদ্যোক্তারা।তবে মণ্ডপসজ্জায় নতুনত্ব থাকলেও প্রতিমার ক্ষেত্রে সাবেকি ধারাকেই বজায় রাখছে ক্লাব। দেবব্রত কর জানান, তাঁদের পুজোয় সাবেকি প্রতিমাতেই দেবী শ্যামার আরাধনা করা হয়। ঐতিহ্য ও আধুনিক মণ্ডপসজ্জার এই মেলবন্ধনই এবারের পুজোর অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।বড় পুজোর আয়োজনের ক্ষেত্রে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক অতীতে কলকাতায় দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আরও সচেতনভাবে পুজোর আয়োজন করতে চাইছে সবুজ সংঘ।দেবব্রত কর জানান, সাধারণ মানুষের সামনে পুজোকে সুন্দরভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। আগের বছরের তুলনায় আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করে পুজোর আয়োজন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।পুজো দেখতে আসা মানুষের যাতে কোনও অসুবিধা না হয় এবং উৎসবের আনন্দের মধ্যে নিরাপত্তার বিষয়টি সুনিশ্চিত করা যায়, সেই দিকেও নজর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ক্লাবের সদস্যরা। তাঁদের মতে, দর্শনার্থীদের সহযোগিতা এবং সচেতন অংশগ্রহণও সুষ্ঠুভাবে পুজো সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।বৃহস্পতিবার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিনে সবুজ সংঘের পুজো প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় খুঁটিপুজো। এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই এবারের শ্যামাপুজোর প্রস্তুতির শুভ সূচনা হয়। লক্ষ্মীপুজোর দিনে খুঁটিপুজোকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন ক্লাব কর্তৃপক্ষ।খুঁটিপুজোর পর থেকেই ধাপে ধাপে এগোবে মণ্ডপ নির্মাণ, আলোকসজ্জা এবং পুজোর অন্যান্য প্রস্তুতির কাজ। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বজায় রেখে এবারও কালিয়াগঞ্জবাসীর কাছে একটি সুন্দর শ্যামাপুজো তুলে ধরতে চাইছেন উদ্যোক্তারা।সবুজ সংঘের সদস্যদের আশা, মানুষের সহযোগিতাকে সঙ্গে নিয়ে ৪৪তম বর্ষের শ্যামাপুজোও দর্শনার্থীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। চমক দেওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, বরং ঐতিহ্য, আলোর রোশনাই, সাবেকি প্রতিমা এবং মানুষের ভালোবাসাকে সঙ্গী করেই এবার উৎসবের ময়দানে নামতে চলেছে কালিয়াগঞ্জের এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাব।