বয়স মাত্র খুদে, ঢাকের বোলে মাত কালিয়াগঞ্জ! সবুজ সংঘের খুঁটিপুজোয় নজর কাড়ল তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র রঙ্গন দাস
তন্ময় চক্রবর্তী , কালিয়াগঞ্জ, উত্তর দিনাজপুর: বয়স তার নিতান্তই কম। এখনও পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। কিন্তু দু’হাতে দুটো কাঠি নিয়ে ঢাকের তালে তালে যখন সে একের পর এক বোল তুলে ধরল, তখন উপস্থিত দর্শকদের চোখেমুখে ফুটে উঠল বিস্ময় আর মুগ্ধতা।
ছোট্ট দু’হাতের এমন নিপুণ ছন্দে ঢাক বাজানো দেখে অবাক কালিয়াগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সবুজ সংঘের সদস্য থেকে শুরু করে উপস্থিত সাধারণ মানুষও। খুদে এই ঢাকির নাম রঙ্গন দাস। বয়সে ছোট হলেও ঢাক বাজানোর প্রতি তার আগ্রহ, একাগ্রতা এবং অসাধারণ প্রতিভা ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছে সকলের।কালিয়াগঞ্জের ইন্ডিয়ানা গ্লোবাল পাবলিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র রঙ্গন। পড়াশোনার পাশাপাশি তার বিশেষ ভালো লাগার জায়গা ঢাক বাজানো। আর সেই শখ থেকেই ধীরে ধীরে ঢাকের ছন্দের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে উঠেছে।
কোনও প্রথাগত প্রশিক্ষণ ছাড়াই নিজের আগ্রহ, পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সে যেভাবে ঢাক বাজানো রপ্ত করেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।রঙ্গনের ঢাক বাজানোর গল্পটাও বেশ আকর্ষণীয়। তার বাবা নন্দদুলাল দাস পেশায় একজন ব্যবসায়ীও কালিয়াগঞ্জের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর শুধু নয় একজন সমাজসেবক ও। পুজোর সময় বাবার সঙ্গে বিভিন্ন মণ্ডপে ঘুরতে যেত রঙ্গন। সেখানে ঢাকিদের ঢাক বাজানো গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখত সে। ঢাকের আওয়াজ, ছন্দ আর ঢাকিদের হাতের দ্রুত চলন ছোট্ট রঙ্গনের মনে গভীরভাবে দাগ কাটে।অন্যদের মতো শুধু দাঁড়িয়ে ঢাকের তালে আনন্দ করেই থেমে থাকেনি সে। বরং ঢাক বাজানোর ইচ্ছা ক্রমশ প্রবল হয়ে ওঠে। একসময় বাবার কাছে একটি ঢাক কিনে দেওয়ার আবদার করে বসে রঙ্গন। ছেলের আগ্রহ বুঝতে পেরে বাবা তার জন্য ঢাক কিনে দেন। এরপর থেকেই বাড়িতে শুরু হয় তার নিজস্ব অনুশীলন।কোনও শিক্ষকের কাছে আলাদা করে তালিম না নিয়েই ঢাকিদের বাজানো দেখে শেখার চেষ্টা করতে থাকে সে। প্রতিদিনের অনুশীলন আর নিজের চেষ্টায় ধীরে ধীরে ঢাকের বিভিন্ন বোল ও ছন্দ আয়ত্ত করতে শুরু করে রঙ্গন। সেই ছোট্ট প্রচেষ্টাই আজ তাকে এনে দিয়েছে পরিচিতি।কালিয়াগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সবুজ সংঘের খুঁটিপুজোর অনুষ্ঠানে এবার বিশেষ আকর্ষণ হয়ে ওঠে রঙ্গন। পুজোর শুভ সূচনার মুহূর্তে তার ঢাক বাজানোর সুযোগ হয়। আর সেই সুযোগেই নিজের প্রতিভার পরিচয় দেয় এই খুদে পড়ুয়া।দু’হাতে কাঠি নিয়ে ঢাকের ওপর একের পর এক ছন্দ তুলে ধরে সে। কখনও দ্রুত তালে, কখনও ছন্দের পরিবর্তনে তার বাজনা উপস্থিত মানুষকে মুগ্ধ করে। বয়সের তুলনায় তার হাতের কাজ এবং ঢাকের বোলের বৈচিত্র্য দেখে অনেকেই অবাক হয়ে যান। সবুজ সংঘের সদস্যদের মধ্যেও তাকে ঘিরে উৎসাহ দেখা যায়।পুজোর খুঁটিপুজোর মতো একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে এমন এক খুদে প্রতিভার উপস্থিতি যেন উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ঢাকের তালে তালে রঙ্গনের আত্মবিশ্বাসী পরিবেশনা বুঝিয়ে দেয়, কোনও কিছুর প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকলে ছোটবেলা থেকেই সেই বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করা যায়।রঙ্গনের কাছে ঢাক বাজানো শুধুই একটি শখ। ঢাকের ছন্দ তাকে আনন্দ দেয়, আর নিজের হাতে সেই ছন্দ তুলে ধরতে পারাটাই তার কাছে বিশেষ প্রাপ্তি। তবে তার স্বপ্ন শুধু ঢাক বাজানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বড় হয়ে সে একজন আইপিএস অফিসার হতে চায়।একদিকে পড়াশোনা, অন্যদিকে ঢাক বাজানোর প্রতি ভালোবাসা—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যেতে চায় এই খুদে পড়ুয়া। তার স্বপ্নের কথা শুনে বোঝা যায়, ছোট্ট বয়সেই ভবিষ্যৎ নিয়ে তার মনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য।রঙ্গনের এই কাহিনি শুধু ঢাক বাজানোর প্রতিভার গল্প নয়, বরং নিজের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে শেখারও একটি সুন্দর উদাহরণ। মণ্ডপে মণ্ডপে ঢাকিদের বাজনা দেখে যে আগ্রহের জন্ম হয়েছিল, আজ তা নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে তার পরিবেশনায়।কালিয়াগঞ্জের সবুজ সংঘের খুঁটিপুজোয় রঙ্গনের ঢাক বাজানো তাই উপস্থিত মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে এক স্মরণীয় মুহূর্ত। আগামী দিনে পড়াশোনার পাশাপাশি ঢাক বাজানোর এই ভালোবাসা সে কত দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তা দেখার অপেক্ষায় থাকবেন অনেকেই। আর ছোট্ট রঙ্গনের স্বপ্ন—একদিন আইপিএস অফিসার হয়ে দেশের মানুষের সেবা করা।
