জমিদারি নেই, জৌলুসও ম্লান—তবু ২০০ বছর ধরে ভেলাইয়ের চৌধুরী বাড়িতে জ্বলছে দুর্গাপুজোর প্রদীপ”

কালিয়াগঞ্জ: সময়ের স্রোতে বদলে গিয়েছে গ্রাম, বদলে গিয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। হারিয়ে গিয়েছে জমিদারি প্রথা, কমেছে পুরনো বাড়ির জৌলুস। কিন্তু দুই শতাব্দী পেরিয়েও ভেলাই গ্রামের চৌধুরী বাড়িতে আজও নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে হয়ে চলেছে দুর্গাপুজো।

 

ইতিহাস, ঐতিহ্য আর পারিবারিক স্মৃতিকে বুকে আগলে আজও দেবীর আরাধনায় মেতে ওঠেন পরিবারের সদস্যরা।উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জের অনন্তপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ভেলাই গ্রামে চৌধুরী বাড়ির এই দুর্গাপুজোর বয়স প্রায় ২০০ বছর। স্থানীয় প্রবীণদের কথায়, যখন এই এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা, তখন আশপাশে তেমন কোনও বড় আকারের দুর্গাপুজোর প্রচলন ছিল না।

 

সেই সময় বর্ধমান থেকে এসে মধুসূদন চৌধুরী ভেলাই গ্রামে বসতি স্থাপন করে শুরু করেন দুর্গাপুজো। সেই শুরু। তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় দুইশো বছর। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই ধারায় চলে আসছে সেই পুজো।একসময় চৌধুরী বাড়ির এই দুর্গাপুজো ছিল গোটা এলাকার অন্যতম আকর্ষণ।

 

পুজোকে কেন্দ্র করে শুধু ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানই নয়, বসত জমজমাট মেলা। সন্ধ্যা নামলেই শুরু হত যাত্রাপালা। দূরদূরান্তের মানুষজনও ছুটে আসতেন ভেলাই গ্রামে। পুজোর কয়েকটি দিন কার্যত উৎসবের আবহে মেতে উঠত গোটা এলাকা।এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একাধিক প্রাচীন রীতি।

 

তার মধ্যে অন্যতম ছিল ষষ্ঠীর সকালে কলাবউকে পালকিতে করে নদীতে নিয়ে গিয়ে স্নান করিয়ে আনা। পরিবারের সদস্যরা সকলে মিলে নদীতে যেতেন। সেখানে নিয়ম মেনে কলাবউকে স্নান করানোর পর পালকিতে করে ফিরিয়ে আনা হত দেবীর স্থানে।

 

সেই দৃশ্য দেখতে আশপাশের গ্রামের বহু মানুষও ভিড় করতেন। সময়ের সঙ্গে সেই জাঁকজমক অনেকটাই কমেছে, কিন্তু পুরনো রীতির স্মৃতি এখনও ধরে রেখেছেন পরিবারের সদস্যরা।

চৌধুরী বাড়ির প্রবীণ সদস্যা অর্চনা চৌধুরী জানান, একসময় ষষ্ঠীর দিন থেকেই বাড়িতে উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়ে যেত। সকলে মিলে নদীতে জল আনতে যেতেন এবং কলাবউকে স্নান করিয়ে পালকিতে করে দেবীর স্থানে নিয়ে আসা হত। তিন দিন ধরে নিয়ম-নিষ্ঠার সঙ্গে চলত পুজোর সমস্ত আচার। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এই পুজো দেখতে আসতেন।তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। নেই সেই জমিদারি, নেই আগের মতো আর্থিক স্বচ্ছলতা। মধুসূদন চৌধুরীর পরবর্তী বংশধরদের অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন। পরিবারের সদস্য সংখ্যাও কমেছে। ফলে একসময় যে পুজোয় ছিল বিপুল আয়োজন, সেই পুজোর জৌলুস এখন অনেকটাই ম্লান।তবুও থেমে যায়নি পুজো।বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের মধ্যেই ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে প্রতিবছর মা দুর্গার আরাধনা করে চলেছে চৌধুরী পরিবার। সামর্থ্য কমেছে, আয়োজন ছোট হয়েছে, কিন্তু নিয়মের ক্ষেত্রে এখনও কোনও আপস করতে চান না পরিবারের সদস্যরা।ভেলাই গ্রামের এই পুজো তাই শুধু একটি দুর্গাপুজো নয়—এ যেন একটি পরিবারের দুই শতাব্দীর ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। এই পুজোর সঙ্গে মিশে রয়েছে জমিদারি আমলের স্মৃতি, গ্রাম গড়ে ওঠার ইতিহাস, পুরনো সামাজিক রীতিনীতি, মেলা-যাত্রার দিনগুলির স্মৃতি এবং একাধিক প্রজন্মের আবেগ।আজও পুজোর দিনগুলিতে পুরনো বাড়ির উঠোনে যখন ঢাকের আওয়াজ ওঠে, ধূপের গন্ধে চারপাশ ভরে যায়, তখন যেন ফিরে আসে সেই পুরনো দিনগুলির স্মৃতি। চোখের সামনে ভেসে ওঠে পালকিতে করে কলাবউকে নদীতে নিয়ে যাওয়ার সেই দৃশ্য, মেলার ভিড়, যাত্রাপালার আসর আর দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের কোলাহল।সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু হারিয়ে গেলেও চৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজো এখনও জানান দেয়—ঐতিহ্য শুধু জাঁকজমকে বেঁচে থাকে না, মানুষের বিশ্বাস, নিষ্ঠা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা স্মৃতির মধ্যেও তার অস্তিত্ব টিকে থাকে।দুইশো বছর আগে যে পুজোর সূচনা হয়েছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা ভেলাই গ্রামে, আজও সেই পুজোর প্রদীপ জ্বলছে। হয়তো আগের মতো নেই জৌলুস, নেই জমিদারি, নেই মেলা-যাত্রার সেই বিপুল আয়োজন। কিন্তু দেবীর সামনে আজও মাথা নত করেন চৌধুরী পরিবারের মানুষ। আর সেই বিশ্বাসই যেন ভেলাই গ্রামের এই ২০০ বছরের প্রাচীন দুর্গাপুজোকে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে চলেছে।