চাকরি শেষে ‘কৃষি সম্রাট’! ছয় বিঘা জমিতে ২৫ রকম ফল, হরেক সবজি ও মাছ চাষে তাক লাগালেন প্রাক্তন শিল্পকেন্দ্রের জিএম সুনীল সরকার
তন্ময় চক্রবর্তী :- ইচ্ছা, জেদ আর নিজের কিছু করার মানসিকতা থাকলে বয়স কখনও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। অবসর মানেই যে নিশ্চিন্তে ঘরে বসে সময় কাটানো, তা যেন নিজের কাজের মধ্য দিয়েই প্রমাণ করে দিলেন উত্তর দিনাজপুর জেলার জেলা শিল্প কেন্দ্রের প্রাক্তন জেনারেল ম্যানেজার সুনীল সরকার।

সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই নিজের গ্রামের বাড়ির পাশে প্রায় ছয় বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন এক অভিনব প্রাকৃতিক কৃষি খামার।

যেখানে একই সঙ্গে রয়েছে নানা প্রজাতির ফল, হরেক রকম শাকসবজি এবং দুটি জলাশয়ে মাছ চাষ।

সুনীলবাবুর এই উদ্যোগ এখন শুধু তাঁর নিজের অবসরজীবনকে আনন্দময় করে তুলেছে তাই নয়, এলাকার বহু মানুষকেও নতুন করে কৃষির প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে।
তাঁর তৈরি বাগানে ঢুকলেই চোখে পড়ে একের পর এক ফলের গাছ। কোথাও আম গাছে থোকায় থোকায় আম, কোথাও সবেদা, কোথাও মালটা-মৌসম্বি, আবার কোথাও পেঁপে, পেয়ারা, কাঁঠাল কিংবা লেবু।
পাশাপাশি জমির অন্য অংশে চলছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির চাষ।স্থানীয় মানুষের অনেকেই এখন ভালোবেসে সুনীল সরকারকে ‘কৃষি সম্রাট’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন।দীর্ঘ কর্মজীবনের পর অবসর নেওয়ার সময় অনেকেই ভাবেন, এবার বাকি জীবন কীভাবে কাটাবেন।

কিন্তু সুনীল সরকার সেই চেনা পথে হাঁটেননি। অবসর গ্রহণের পরই তিনি ফিরে আসেন নিজের গ্রামের বাড়িতে। নিজের জমিকে কাজে লাগিয়ে শুরু করেন প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে কৃষিকাজ।সুনীলবাবুর কথায়, অবসরের পর তাঁর প্রথম লক্ষ্যই ছিল গ্রামের বাড়িতে থেকে নিজের মতো করে জীবন কাটানো।

নিজের জমি রয়েছে, সেই জমিকে কাজে লাগিয়েই শেষ জীবনটা সুন্দরভাবে কাটাতে চেয়েছেন তিনি। শুধু নিজের ভালো থাকা নয়, গ্রামের মানুষও যাতে ভালো থাকে এবং স্বাস্থ্যকর খাবার পায়, সেটাও তাঁর অন্যতম উদ্দেশ্য।তাই রাসায়নিক নির্ভর চাষের পরিবর্তে তিনি বেছে নিয়েছেন ন্যাচারাল ও অর্গানিক ফার্মিং।প্রায় ছয় বিঘা জমিতে সুনীলবাবুর তৈরি বাগানে রয়েছে ২০ থেকে ২৫ রকমের ফলের গাছ। এর মধ্যে বিভিন্ন প্রজাতির আম রয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। পাশাপাশি রয়েছে সুপারি, মালটা, মৌসম্বি, সবেদা, লেবু, কাঁঠাল, পেয়ারা, পেঁপে-সহ নানা ধরনের ফলের গাছ।সবচেয়ে আকর্ষণের বিষয়, অবসর নেওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই তাঁর তৈরি বাগানে ফলন শুরু হয়ে গিয়েছে।
আম, সবেদা, মালটা-সহ বিভিন্ন গাছে ফল ধরায় রীতিমতো উচ্ছ্বসিত সুনীলবাবু নিজেও।তিনি জানান, মাটিকে সঠিকভাবে প্রস্তুত করা এবং গাছ লাগানোর আগে জমির উপযুক্ত পরিচর্যাই তাঁর সাফল্যের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি বৃষ্টির জল ধরে রাখার জন্য তিনি তৈরি করেছেন দুটি রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং ব্যবস্থা।সুনীল সরকারের খামারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—তিনি কোনও রকম রাসায়নিক সার ব্যবহার না করেই ফল ও শাকসবজি উৎপাদনের চেষ্টা করছেন। পটল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সবজি, ওল, কচু-সহ একাধিক ফসল রয়েছে তাঁর জমিতে।এই উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলের একটি অংশ স্থানীয় বাজারেও বিক্রি করা হয়। তাঁর উদ্দেশ্য, কালিয়াগঞ্জ শহর ও গ্রামের সাধারণ মানুষ যাতে তুলনামূলক কম দামে ভালো ও স্বাস্থ্যকর শাকসবজি পেতে পারেন।শুধু ফল কিংবা সবজি নয়, সুনীলবাবুর কৃষি ভাবনায় রয়েছে সমন্বিত চাষের পরিকল্পনাও। তাঁর জমিতে রয়েছে দুটি জলাশয়। সেই জলাশয়ে চলছে বিভিন্ন ধরনের মাছের চাষ।জলাশয়গুলিতে ট্যাংরা, সিঙ্গি, রুই, কাতলা, মৃগেল, বাটা, গ্রাস কার্প-সহ একাধিক প্রজাতির মাছ রয়েছে। অর্থাৎ একই জমিতে ফল, সবজি ও মাছ—তিন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি।এত ধরনের চাষ একসঙ্গে করতে গিয়ে কম পরিশ্রম করতে হয়নি সুনীলবাবুকে। তিনি জানান, কৃষিকাজের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁকে অনেক পড়াশোনা করতে হয়েছে। পাশাপাশি মাঠে নেমে বাস্তব অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন।
