রায়গঞ্জে AIIMS-এর ধাঁচে হাসপাতাল গড়ার প্রস্তাব কেন্দ্রকে পাঠাবে রাজ্য! রায়গঞ্জের জনসভা থেকে একগুচ্ছ বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর

 

তন্ময় চক্রবর্তী  রায়গঞ্জ থেকে  ঃ–  উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন এবং উত্তর দিনাজপুর জেলার দীর্ঘদিনের দাবিকে সামনে রেখে রায়গঞ্জে AIIMS-এর ধাঁচে হাসপাতাল গড়ে তোলার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর কথা ঘোষণা করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার রায়গঞ্জে প্রশাসনিক বৈঠকের পর এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি জেলার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রেল যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, শিল্প, কৃষি ও পরিকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন।

তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে কালিয়াগঞ্জে নতুন মহিলা কলেজ, হেমতাবাদে কলেজ, ইটাহার-হেমতাবাদ ও করনদিঘিতে নতুন দমকল কেন্দ্র এবং টুঙ্গিদিঘিতে নতুন পৌরসভা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা।মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই সরকার শুধু মুখে কথা বলে না, কাজ করে দেখায়।” তাঁর দাবি, উত্তর দিনাজপুর জেলার উন্নয়নে এখনও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। সেই কাজগুলি পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করাই রাজ্য সরকারের লক্ষ্য। জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে শুরু করে রেল যোগাযোগ, শিক্ষার সুযোগ এবং কর্মসংস্থান—প্রতিটি ক্ষেত্রেই উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।উত্তর দিনাজপুর জেলার স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়নের ক্ষেত্রে রায়গঞ্জে AIIMS-এর ধাঁচে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলার প্রস্তাব বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই হাসপাতাল নির্মাণের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে।

 

দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরবঙ্গের বাসিন্দারা উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার পরিকাঠামো বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসছেন। রায়গঞ্জে এই ধরনের হাসপাতাল গড়ে উঠলে উত্তর দিনাজপুরের পাশাপাশি আশপাশের জেলার বাসিন্দারাও উপকৃত হতে পারেন।রেল যোগাযোগের উন্নয়ন নিয়েও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, কালিয়াগঞ্জ-বুনিয়াদপুর নতুন রেলপথ প্রকল্পের জন্য খুব শীঘ্রই কেন্দ্রীয় সরকারকে জমি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

 

দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কালিয়াগঞ্জ ও বুনিয়াদপুরের মধ্যে রেল যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর ফলে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াতের পাশাপাশি এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও উপকৃত হতে পারে।এ ছাড়াও উত্তর দিনাজপুর জেলায় ছয়টি রেল ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

আলুয়াবাড়ি রোড থেকে নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত তৃতীয় ও চতুর্থ ব্রডগেজ লাইন নির্মাণের জন্যও রাজ্য সরকার জমি দেওয়ার উদ্যোগ নেবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।কানকি রেল স্টেশনে দুটি নতুন প্ল্যাটফর্ম নির্মাণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, আগের সরকারের আমলে যে বিষয়টি আটকে ছিল, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেলের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র বা NOC দিয়ে দিয়েছে। রেল পরিকাঠামোর এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি আসবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।শিক্ষা ও জরুরি পরিষেবার পরিকাঠামো বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও একগুচ্ছ ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণায় ইটাহার, হেমতাবাদ এবং করনদিঘিতে নতুন দমকল কেন্দ্র স্থাপনের কথা উঠে আসে।

 

 

এই কেন্দ্রগুলি চালু হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার অগ্নিকাণ্ড ও অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হতে পারে।শিক্ষাক্ষেত্রে কালিয়াগঞ্জের জন্য নতুন মহিলা কলেজ স্থাপনের ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পাশাপাশি হেমতাবাদেও একটি কলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। এই উদ্যোগগুলি বাস্তবায়িত হলে উচ্চশিক্ষার জন্য জেলার ছাত্রী ও ছাত্রছাত্রীদের আরও সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে উচ্চশিক্ষার পরিকাঠামো বাড়লে দূরের কলেজে যাতায়াতের চাপও কমতে পারে।এ ছাড়া জেলার টুঙ্গিদিঘিতে নতুন পৌরসভা গড়ে তোলার ঘোষণাও করেন মুখ্যমন্ত্রী। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকার নাগরিক পরিষেবা ও প্রশাসনিক পরিকাঠামো সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে উত্তর দিনাজপুরের নিরাপত্তা প্রসঙ্গও উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি জানান, সীমান্ত নিরাপত্তার পরিকাঠামো জোরদার করতে বিএসএফকে সাত একরেরও বেশি জমি হস্তান্তর করা হয়েছে।অনুপ্রবেশের অভিযোগ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, যাঁরা অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের চলে যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।

নির্দেশ না মানলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজ্য সরকার কঠোর অবস্থান নেবে বলে তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট বার্তা উঠে আসে।জনসভায় রাজ্য সরকারের অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের পরিসংখ্যানও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উত্তর দিনাজপুর জেলায় এই প্রকল্পের জন্য মোট ৬ লক্ষ ৯৭ হাজার ৫৪৭ জন আবেদন করেছিলেন। আবেদনগুলি খতিয়ে দেখার পর ৫ লক্ষ ৯৭ হাজার ৬৬৯ জনের আবেদন বিবেচনায় আসে বলে তিনি জানান।মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, তাঁদের মধ্যে ৪ লক্ষ ৩২ হাজার ৯৩২ জন উপভোক্তাকে গত ১৫ অক্টোবর ৩,০০০ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের মাধ্যমে জেলার বহু মানুষের কাছে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি রাজ্য সরকারের জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন।আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের প্রসঙ্গেও বক্তব্য রাখেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জেলায় ২৩ লক্ষ ৭৮ হাজার ৩৫ জনের জন্য এই প্রকল্পের কার্ড বিলির উদ্যোগ রয়েছে এবং বহু কার্ড ইতিমধ্যেই বিতরণ করা হয়েছে।কর্মসংস্থান ও যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়েও একাধিক প্রতিশ্রুতি দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, যুবকদের জন্য খুব শীঘ্রই ‘ভরসা’ স্কিম ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের কথাও বলেন তিনি।শিক্ষা ব্যবস্থায় শূন্যপদ পূরণ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই ঘোষণাগুলি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে নিয়োগের সময়সূচি, শূন্যপদের বিভাগভিত্তিক সংখ্যা এবং আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী সরকারি বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যাবে।উত্তর দিনাজপুরের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে জেলার ভুট্টা, আনারস, তুলাইপাঞ্জি চাল, আমসহ বিভিন্ন কৃষিজ ও উদ্যানজাত পণ্যের উৎপাদন ও উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী।তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে জেলার কৃষিজ পণ্যের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি শিল্পতালুক গড়ে তোলার পরিকল্পনাও। খুব শীঘ্রই জেলায় শিল্পতালুক গড়ে উঠবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। শিল্পের বিকাশ ঘটলে স্থানীয় যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং জেলার অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।রাজ্যের পুরনো মঠ ও মন্দিরগুলির সংস্কার নিয়েও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, ঐতিহ্যবাহী মঠ-মন্দিরগুলির দ্রুত সংস্কারের জন্য ১,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংরক্ষণের পাশাপাশি এই উদ্যোগের মাধ্যমে রাজ্যের ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টা করা হবে বলে তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।

চোপড়া, চাকুলিয়া, ডালখোলা ও ইসলামপুরের মতো এলাকায় চা-বাগান সংলগ্ন জমি দখলের অভিযোগ নিয়েও কড়া অবস্থানের কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, যেসব জমি জোর করে দখল করে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলি উদ্ধারের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ করা হবে।চোপড়ার বিধায়ক হামিদুর রহমানের বিরুদ্ধে অতীতে থানায় চাপা পড়ে থাকা মামলাগুলি পুনরায় চালু করার জন্য ইসলামপুর জেলা পুলিশকে নির্দেশ দেওয়ার কথাও জনসভায় জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, অপরাধ করলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তবে সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলির তদন্ত, মামলার বর্তমান অবস্থা এবং আইনগত পদক্ষেপের বিস্তারিত তথ্য পুলিশ বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।রায়গঞ্জে মুখ্যমন্ত্রীর এই জনসভায় বহু মানুষের সমাগম হয়। উপস্থিত ছিলেন রায়গঞ্জের সাংসদ কার্তিক চন্দ্র পাল, রায়গঞ্জের বিধায়ক কৌশিক চৌধুরী, কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক উৎপল মহারাজ, হেমতাবাদের বিধায়ক-সহ অন্যান্য জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।সব মিলিয়ে, রায়গঞ্জের প্রশাসনিক বৈঠকের পর জনসভা থেকে উত্তর দিনাজপুর জেলার স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রেল যোগাযোগ, অগ্নিনির্বাপণ পরিষেবা, কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থান নিয়ে একাধিক ঘোষণা সামনে আনলেন মু

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এবার জেলার মানুষের নজর থাকবে ঘোষিত প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন, জমি হস্তান্তরের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্তগুলির কার্যকর রূপ পাওয়ার দিকে।