রাজনীতির ঊর্ধ্বে সম্প্রীতির রাখি! কালিয়াগঞ্জে সাংসদের হাতে বিধায়ক, বিরোধী কাউন্সিলরদের সঙ্গে এক মঞ্চে শাসকদল—ভ্রাতৃত্বের বার্তায় নজর কাড়ল রাখি বন্ধন উৎসব
তন্ময় চক্রবর্তী রাজনীতির বিভেদ ভুলে ভালোবাসা, ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও জাতীয়তাবাদের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার বার্তা নিয়ে কালিয়াগঞ্জে পালিত হলো রাখি বন্ধন উৎসব। উত্তর দিনাজপুর জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের সহযোগিতায়, জেলা যুব কল্যাণ ও ক্রীড়া দপ্তরের আয়োজনে এবং কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে কালিয়াগঞ্জের বিবেকানন্দ মোড়ে আয়োজিত এই রাখি বন্ধন উৎসব কার্যত পরিণত হয় সম্প্রীতির মিলনমেলায়।এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রায়গঞ্জের সাংসদ তথা কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার পৌরপতি কার্তিক চন্দ্র পাল, কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক উৎপল ব্রহ্মচারী, কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার বিজেপি কাউন্সিলরদের পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলর এবং এলাকার সাধারণ মানুষ।
রাজনৈতিক মতাদর্শে পার্থক্য থাকলেও রাখির বন্ধনে এদিন সকলকে একসঙ্গে দেখা যায়।রাখি বন্ধন উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল রায়গঞ্জের সাংসদ তথা কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার পৌরপতি কার্তিক চন্দ্র পাল এবং কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক উৎপল ব্রহ্মচারীর পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ মুহূর্ত। অনুষ্ঠানে সাংসদ কার্তিক চন্দ্র পাল বিধায়ক উৎপল ব্রহ্মচারীর হাতে রাখি পরিয়ে দেন এবং মিষ্টিমুখ করান।পাশাপাশি বিধায়ক উৎপল ব্রহ্মচারীকেও দেখা যায় পথচলতি সাধারণ মানুষের হাতে রাখি পরিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। ফলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও এই উৎসবের অংশ হয়ে ওঠেন।অনুষ্ঠানে রায়গঞ্জের সাংসদ তথা কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার পৌরপতি কার্তিক চন্দ্র পাল রাখি বন্ধনের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, রাখি শুধুমাত্র ভাই-বোনের সম্পর্কের প্রতীক নয়, এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধনের প্রতীক।তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল—রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সামাজিক সম্প্রীতি অটুট থাকা জরুরি। সমাজের সমস্ত স্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে শান্তি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের পরিবেশ গড়ে তোলাই এই ধরনের উৎসবের অন্যতম উদ্দেশ্য।কার্তিক চন্দ্র পালের কথায়, “রাখির বন্ধন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা সবাই একই সমাজের অংশ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের সম্পর্ক এবং সম্প্রীতিকে কখনও দূরে সরিয়ে রাখা উচিত নয়।”কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক উৎপল ব্রহ্মচারীও রাখি বন্ধন উৎসবের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, রাখি এমন একটি উৎসব যা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে।তিনি বলেন, সমাজে বিভিন্ন মত, পথ ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার মানুষ থাকবেন। কিন্তু উৎসবের মঞ্চে সকলের একত্রিত হওয়া সামাজিক সম্প্রীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে এই ধরনের অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।বিধায়কের বক্তব্যে উঠে আসে “রাজনীতির ঊর্ধ্বে মানুষ”-এর বার্তা। তিনি সাধারণ মানুষকে রাখি পরিয়ে তাঁদের শুভেচ্ছা জানান এবং সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান।এদিনের রাখি বন্ধন উৎসবকে ঘিরে আরও একটি বিষয় সাধারণ মানুষের নজর কাড়ে। রাজনৈতিক পালাবদলের পর কালিয়াগঞ্জ পৌরসভা বিজেপির দখলে আসার পর পৌরসভার পক্ষ থেকে বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলরদেরও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়।আর সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর এদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। তাঁদের সাংসদ, বিধায়ক এবং বিজেপির কাউন্সিলরদের সঙ্গে একই অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা যায়।এদিনের এই দৃশ্য কার্যত রাজনৈতিক মহলেও আলাদা বার্তা বহন করে। অতীতের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রসঙ্গ তুলে অনেকেই বলেন, ক্ষমতায় থাকা ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক লড়াই থাকতেই পারে, কিন্তু সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সকলকে সঙ্গে নিয়ে চলার পরিবেশ তৈরি হলে তা সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেয়।অনুষ্ঠানে উপস্থিত তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলরদের বক্তব্যেও উঠে আসে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বার্তা। তাঁদের মতে, রাখি বন্ধন কোনও একটি রাজনৈতিক দলের উৎসব নয়। এটি মানুষের উৎসব। তাই রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে এমন অনুষ্ঠানে সকলের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তাঁদের বক্তব্য, পৌরসভার পক্ষ থেকে বিরোধী কাউন্সিলরদের আমন্ত্রণ জানানো একটি সৌজন্যমূলক ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। রাজনৈতিক মঞ্চে মতের লড়াই থাকলেও শহরের উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থে সকলের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা দরকার।এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাধারণ মানুষও এই মিলনমেলার দৃশ্যকে স্বাগত জানান। তাঁদের বক্তব্য, রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও শহরের সামাজিক অনুষ্ঠানে যদি সকল জনপ্রতিনিধি একসঙ্গে থাকেন, তাহলে তার প্রভাব সাধারণ মানুষের উপরও ইতিবাচক হয়।এক সাধারণ মানুষের কথায়, “রাজনীতির সময় রাজনীতি হবে, কিন্তু উৎসবের দিনে সবাই যদি একসঙ্গে থাকেন, সেটাই সবচেয়ে ভালো ছবি। আজ কালিয়াগঞ্জে সেই ছবিটাই দেখা গেল।”আরেকজনের বক্তব্য, রাখি বন্ধন মূলত ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের উৎসব। তাই রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে গিয়ে সকলের একসঙ্গে উৎসবে অংশগ্রহণই এই দিনের সবচেয়ে বড় সাফল্য।শুধু রাখি পরানো ও মিষ্টিমুখ নয়, এদিনের অনুষ্ঠানকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে কালিয়াগঞ্জের বিবেকানন্দ মোড়ে ছোট্ট একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। সেখানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানে অন্য মাত্রা যোগ হয়।উৎসবকে ঘিরে এলাকায় সাধারণ মানুষের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। রাখি পরানো, মিষ্টিমুখ, শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—সব মিলিয়ে বিবেকানন্দ মোড়ে তৈরি হয় উৎসবের আবহ।সব মিলিয়ে এদিনের রাখি বন্ধন উৎসব যেন একটি প্রতীকী বার্তা দিয়ে গেল—রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হলেও সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নে মানুষ এক। সাংসদ থেকে বিধায়ক, বিজেপি কাউন্সিলর থেকে তৃণমূল কাউন্সিলর, জনপ্রতিনিধি থেকে পথচলতি সাধারণ মানুষ—সকলের হাতেই এদিন উঠল রাখির বন্ধন।রাজনীতির উত্তাপকে কিছুক্ষণের জন্য দূরে সরিয়ে রেখে কালিয়াগঞ্জের বিবেকানন্দ মোড়ে তৈরি হওয়া এই সৌহার্দ্যের পরিবেশকে সাধারণ মানুষও স্বাগত জানালেন। তাঁদের আশা, রাখির এই বন্ধন শুধু একটি দিনের অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আগামী দিনেও সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য এবং ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেবে।

