যুদ্ধের আবহে রাসায়নিক সারের সংকটের আশঙ্কা, মাটির শক্তি ফেরাতে প্রাকৃতিক কৃষির ডাক — কালিয়াগঞ্জের কর্মশালায় কৃষকদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
তন্ময় চক্রবর্তী আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতার প্রেক্ষাপটে কৃষির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের স্বনির্ভর, কম খরচের এবং বিষমুক্ত চাষাবাদের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জে অনুষ্ঠিত হলো প্রাকৃতিক কৃষি বিষয়ক এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালা।
কর্মশালায় কৃষিবিদরা স্পষ্ট বার্তা দেন—“মাটি বাঁচলে কৃষক বাঁচবে, আর কৃষক বাঁচলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত থাকবে।”কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার ভবনে আয়োজিত এই কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন চোপড়া কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্রের কৃষি বিজ্ঞানী Dr. Dhananjay Mondal, কালিয়াগঞ্জ ব্লকের কৃষি আধিকারিক Moumita Ghosh, পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি Buli Roy সহ এলাকার বহু কৃষক ও কৃষি-উদ্যোক্তা।কর্মশালায় বক্তারা জানান, বিশ্বজুড়ে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ভবিষ্যতে রাসায়নিক সারের সরবরাহে বড় ধরনের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ এখনও অনেকাংশে রাসায়নিক সার আমদানির উপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে কৃষকদের উপর।এছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা ও জৈবগুণ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে খাদ্যশস্যে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থেকে মানুষের স্বাস্থ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এখনই বিকল্প চাষপদ্ধতির দিকে ঝুঁকতে হবে বলে মত প্রকাশ করেন তাঁরা।

কর্মশালার অন্যতম আকর্ষণ ছিল হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ। কৃষকদের দেখানো হয় কীভাবে বাড়ির আশপাশে সহজলভ্য উপকরণ যেমন গোবর, মাটি, নিমপাতা, পেঁপে পাতা, আদা, হলুদ, কাঁচালঙ্কা, দুধ এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে জৈব সার ও প্রাকৃতিক কীটনাশক তৈরি করা যায়।
এই পদ্ধতিতে চাষ করলে খরচ যেমন কমবে, তেমনি জমির উর্বরতাও দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকবে বলে জানান কৃষিবিদরা।বক্তারা বলেন, প্রাকৃতিক কৃষি শুধু একটি চাষপদ্ধতি নয়, এটি একটি টেকসই কৃষি আন্দোলন। এর মাধ্যমে কৃষকরা রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভর হতে পারবেন।

একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা, মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের পথও সুগম হবে।কৃষকদের উদ্দেশে বার্তা দিয়ে কৃষি বিজ্ঞানীরা বলেন, “আজকের দিনে মাটিকে বাঁচানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জমির শক্তি ফিরিয়ে আনতে হবে, বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রাকৃতিক কৃষিই সেই পথ দেখাতে পারে।”কর্মশালার শেষে কৃষকদের মধ্যে প্রাকৃতিক কৃষি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। কৃষকদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ দেখে আয়োজকরাও আশাবাদী যে আগামী দিনে উত্তর দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চা আরও বিস্তৃত হবে।
