নবান্নের পর এবার কি গেরুয়া হবে কালিয়াগঞ্জ পৌরসভা?রঙের রাজনীতিতে তুঙ্গে জল্পনা, বিজেপি কর্মীদের জোর দাবি—বদলাক পৌর ভবনের চেহারা
তন্ময় চক্রবর্তী উত্তর দিনাজপুর জেলার অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শহর কালিয়াগঞ্জ। একসময় অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে এই শহরের পরিচিতি ছিল সুদূরপ্রসারী। ধান, পাট, গম, ভুট্টা ও সরিষার তেলের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে কালিয়াগঞ্জ উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি পূর্ব ভারতেরও একটি উল্লেখযোগ্য বাজারে পরিণত হয়। রেল ও সড়ক যোগাযোগের সুবিধার কারণে কলকাতা, বিহার, অসম এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)-এর সঙ্গে এই শহরের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়।স্বাধীনতার পর দেশভাগের ফলে অবিভক্ত দিনাজপুর জেলা বিভক্ত হয়। পরে ১৯৯২ সালের ১ এপ্রিল পশ্চিম দিনাজপুর ভেঙে উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর—দুটি পৃথক জেলার সৃষ্টি হলে কালিয়াগঞ্জ উত্তর দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ধীরে ধীরে জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, শিক্ষা, ব্যবসা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে শুরু করে।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও নাগরিক পরিষেবার চাহিদার কথা মাথায় রেখে ১৯৮৭ সালে কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার প্রতিষ্ঠা হয়। প্রথমদিকে ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে ওয়ার্ড সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭-তে। প্রায় ১১.৬৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই পৌরসভা বর্তমানে পানীয় জল সরবরাহ, রাস্তা নির্মাণ, নিকাশি ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্ট্রিট লাইট, স্বাস্থ্য পরিষেবা, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক পরিষেবা প্রদান করে আসছে। পাশাপাশি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের একাধিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।তবে নাগরিক পরিষেবার পাশাপাশি এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার ভবনের রং।স্থানীয়দের একাংশের দাবি, পৌরসভার রাজনৈতিক প্রশাসনের পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে ভবনের বাহ্যিক রঙেও পরিবর্তন এসেছে। অ্যাড-হক বোর্ডের সময় পৌর ভবনের রং ছিল এক ধরনের। পরে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত বোর্ডের আমলে প্রথমে সবুজ এবং পরবর্তীতে নীল-সাদা রঙে রাঙানো হয় পৌর ভবন। ফলে অনেকের মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৌর ভবনের রংও যেন রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।২০২৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর কালিয়াগঞ্জেও নতুন করে উঠেছে ‘গেরুয়া রঙে পৌরসভা’ করার দাবি। বিজেপির একাংশ কর্মী-সমর্থকদের বক্তব্য, রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দপ্তর নবান্নের রঙে পরিবর্তন ঘটলে কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার ভবনের রংও নতুন সরকারের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গেরুয়া হওয়া উচিত।তাদের দাবি, পৌর ভবনের রং পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং নতুন প্রশাসনিক অধ্যায়েরও প্রতীক হতে পারে। তাই দ্রুত পৌর ভবনের রং পরিবর্তন করে গেরুয়া করা হোক।ইতিমধ্যেই কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যানের দপ্তর গেরুয়া রঙে রাঙানো হয়েছে। এই ঘটনাকে সামনে রেখেই রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা শুরু হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের ধারণা, এটি হয়তো ভবিষ্যতে গোটা পৌর ভবনের রঙ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে পৌরসভার পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি।অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সরকারি ভবনের রং নিয়ে বিতর্কের চেয়ে নাগরিক পরিষেবার উন্নয়নই হওয়া উচিত প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। রাস্তা, পানীয় জল, নিকাশি, পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও নগর পরিকাঠামোর উন্নয়নের মতো বিষয়গুলিই সাধারণ মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজনৈতিক প্রতীক ও জনমানসের মধ্যে রঙের প্রভাবকে সম্পূর্ণ উড়িয়েও দেওয়া যায় না। সেই কারণেই কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার রং নিয়ে বিতর্ক এখন স্থানীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।এখন দেখার বিষয়, বিজেপি কর্মীদের এই দাবি রাজনৈতিক দাবিতেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি আগামী দিনে সত্যিই কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার ভবন নতুন রূপে, গেরুয়া রঙে সেজে ওঠে। সেই উত্তর দেবে সময়ই।



