সরকারি নথিতে ‘উধাও’ শ্রীমতি নদী! রায়তি সম্পত্তির জালে হারাচ্ছে কালিয়াগঞ্জের ঐতিহ্য, উঠছে বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ
তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ | ১৬ মে :“বলো কোথায় তোমার দেশ, তোমার নাই কি চলার শেষ, ও নদীরে…” — কিংবদন্তি শিল্পী Hemanta Mukhopadhyay-র সেই বিখ্যাত গানের মতোই যেন আজ প্রশ্ন তুলছে কালিয়াগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শ্রীমতি নদী। তবে এবার মানুষ নদীকে নয়, নদীই যেন মানুষের কাছে জানতে চাইছে—

“আমার অস্তিত্ব কোথায় হারিয়ে গেল?”উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ শহর ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকার প্রাণ হিসেবে পরিচিত শ্রীমতি নদী আজ কার্যত অস্তিত্ব সংকটে। অভিযোগ, সরকারি আধিকারিকদের একাংশের মদতেই ভূমি সংস্কার দপ্তরের রেকর্ডে নদীর বিশাল অংশের চরিত্র বদলে ফেলা হয়েছে। কোথাও নদীকে দেখানো হয়েছে ‘দহলা’, কোথাও ‘ডোবা’, আবার কোথাও সরাসরি ‘রায়তি সম্পত্তি’। ফলে সরকারি নথিতেই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে নদীর স্বাভাবিক অস্তিত্ব।স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্নীতি ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশে তিলে তিলে “খুন” করা হচ্ছে শ্রীমতি নদীকে। আর সেই কারণেই নদীর বুক জুড়ে এখন অবাধে চলছে বোরো চাষ, জমি দখল এবং একের পর এক ইমারত নির্মাণ। কালিয়াগঞ্জ ব্লকের অনন্তপুর, ধনকোল-সহ বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে শহর এলাকাতেও নদীর জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমান বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলার জাবরহাট ইউনিয়নের বড়বাড়ি বিল থেকে উৎপত্তি এই শ্রীমতি নদীর। সেখান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে নদীটি ভুরকুটপাড়া হয়ে কালিয়াগঞ্জ শহরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে বহু বছর ধরে। একসময় এলাকার কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই নদী।কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। নদীর গতিপথের বহু অংশে চলছে চাষাবাদ, কোথাও আবার স্থায়ী নির্মাণ। অভিযোগ উঠেছে, ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের একাংশের গাফিলতি কিংবা পরিকল্পিত ভূমিকা ছাড়া এমন ঘটনা সম্ভব নয়।স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আর এস খতিয়ানের ম্যাপে এখনও স্পষ্টভাবে শ্রীমতি নদীর অস্তিত্ব রয়েছে। অথচ পরবর্তী রেকর্ড সংশোধনের সময় নদীর চরিত্র বদলে দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন।কালিয়াগঞ্জ নদী বাঁচাও কমিটির সম্পাদক প্রসূন দাস বলেন, “নতুন সরকার যেন অবিলম্বে তদন্ত করে দেখে কীভাবে একটি জীবন্ত নদী রায়তি সম্পত্তিতে পরিণত হল। আমরা চাই শ্রীমতি নদীকে পুনরায় তার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হোক এবং সমস্ত অবৈধ দখলদারি উচ্ছেদ করা হোক।”অন্যদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূমি সংস্কার দপ্তরের এক আধিকারিক জানান, “আর এস ম্যাপ অনুযায়ী নদীর গতিপথ ঠিকই রয়েছে। তবে মাঠ খসড়া ও পরবর্তী রেকর্ড তৈরির সময় পরিস্থিতির ভিত্তিতে কিছু পরিবর্তন হয়ে থাকতে পারে। যারা বর্তমানে নদীর জমিতে চাষ করছেন, তাঁদের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে কিনা, সেটাও খতিয়ে দেখা দরকার।”তিনি আরও স্বীকার করেন, এল আর ম্যাপ অনুযায়ী শ্রীমতি নদী অনেকটাই তার পুরনো চরিত্র হারিয়েছে।প্রশ্ন উঠছে—একটি ঐতিহ্যবাহী নদী কীভাবে সরকারি নথিতে ধীরে ধীরে‘উধাও’ হয়ে যায়?কার স্বার্থে বদলে যায় নদীর পরিচয়?
আর প্রশাসনের নীরবতার আড়ালে কি লুকিয়ে রয়েছে আরও বড় কোনও ভূমি কেলেঙ্কারি?এখন সেই উত্তর খুঁজছে কালিয়াগঞ্জের মানুষ।

