শোকের আবহে বড় ভাইদার স্মৃতিকে সঙ্গী করেই মহেন্দ্রগঞ্জ রায় কলোনির শ্যামাপুজো! গ্রামবাংলার পরিবেশ ও ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর থিমে দর্শনার্থীদের চমক দিতে প্রস্তুতি শুরু
তন্ময় চক্রবর্তী , কালিয়াগঞ্জ: উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ শহরের সার্বজনীন শ্যামাপুজোগুলির মধ্যে থিমের অভিনবত্ব ও মণ্ডপসজ্জার বৈচিত্র্যে প্রতি বছরই দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে কালিয়াগঞ্জ মধ্যা আখানগর মহেন্দ্রগঞ্জ রায় কলোনি শ্রী শ্রী শ্যামা পূজা কমিটির পুজো । প্রতিবছরই নতুন ভাবনা, সৃজনশীল মণ্ডপসজ্জা এবং প্রতিমার অভিনব রূপের মধ্য দিয়ে দর্শনার্থীদের চমক দেওয়ার চেষ্টা করে এই পুজো কমিটি। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

তবে এবারের পুজোর প্রস্তুতিতে আনন্দের পাশাপাশি জড়িয়ে রয়েছে গভীর শোক ও আবেগ। পুজো কমিটির সকলের প্রিয় বড় ভাইদা আর তাঁদের মধ্যে নেই। তাঁর স্মৃতি ও পুজোকে ঘিরে থাকা স্বপ্নকে সামনে রেখেই এ বছর শ্যামাপুজোর আয়োজন করতে চলেছেন উদ্যোক্তারা।

পুজো কমিটির অন্যতম সদস্য সুজিত মহন্ত জানান, প্রতিবছরই তাঁদের পুজোর দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সামলাতেন এলাকার সকলের পরিচিত ও প্রিয় বড় ভাইদা। তাঁর নেতৃত্ব, চিন্তাভাবনা এবং পুজোকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের ইচ্ছা কমিটির সদস্যদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত।

কিন্তু এ বছর তিনি সকলকে ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতি পুজো কমিটির প্রত্যেক সদস্যের মনকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে।সুজিত মহন্ত বলেন, বড় ভাইদা যেভাবে পুজোর আয়োজন করে আসতেন, তাঁর সেই ভাবনা ও ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়েই এ বছরও একই ধারাকে বজায় রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা। তাঁর স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই এবার পুজো কমিটির অন্যতম লক্ষ্য। তাই শোককে শক্তিতে পরিণত করে নতুন উদ্যমে পুজোর প্রস্তুতিতে নেমেছেন কমিটির সদস্যরা।
এবার মহেন্দ্রগঞ্জ রায় কলোনির শ্রীশ্রী শ্যামাপুজোর মূল আকর্ষণ হতে চলেছে গ্রামবাংলার চিরাচরিত পরিবেশ এবং ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর বর্ণময় উপস্থাপনা। বাংলার গ্রামীণ জীবনযাত্রা, লোকসংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং বারো মাস জুড়ে বাঙালির নানা উৎসবকে মণ্ডপসজ্জার মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শহুরে জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার সহজ-সরল পরিবেশ ও বাঙালির নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ছবি এই মণ্ডপে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করবেন শিল্পীরা।মণ্ডপের বিভিন্ন অংশে ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর ভাবনাকে কেন্দ্র করে বাংলার নানা উৎসব ও লোকাচারের চিত্র তুলে ধরা হবে। বছরের বিভিন্ন সময়ে গ্রামবাংলার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা উৎসব, পার্বণ এবং সামাজিক আনন্দের মুহূর্তগুলি মণ্ডপসজ্জার মধ্য দিয়ে উপস্থাপিত হওয়ার কথা। ফলে শ্যামাপুজোর মণ্ডপে প্রবেশ করেই দর্শনার্থীরা যেন গ্রামবাংলার চেনা পরিবেশ ও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসবের সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছেন উদ্যোক্তারা।শুধু মণ্ডপসজ্জাই নয়, প্রতিমাতেও থাকছে বিশেষত্ব। পুজো কমিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, বুনিয়াদপুরের মৃৎশিল্পী রাজু সরকার ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিমা নির্মাণ করবেন। অন্যদিকে, মণ্ডপসজ্জার দায়িত্বে থাকছেন বালুরঘাট থেকে আসা শিল্পী। প্রতিমা নির্মাণ ও মণ্ডপসজ্জার মধ্যে বিষয়ভিত্তিক সামঞ্জস্য রেখে গোটা পুজো প্রাঙ্গণকে একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পভাবনায় সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। এর সঙ্গে থাকছে আকর্ষণীয় আলোকসজ্জা, যা রাতের অন্ধকারে মণ্ডপের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে আশা করছেন তাঁরা।পুজো কমিটির আর এক অন্যতম সদস্য প্রকাশ কুন্ডু জানান, প্রতি বছরের মতো এ বছরও তাঁদের পুজোকে কেন্দ্র করে দর্শনার্থীদের জন্য বিভিন্ন আকর্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিবছরই এই পুজো প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। এ বছরও বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম হবে বলে তিনি আশাবাদী। দর্শনার্থীরা যাতে মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমা ও আলোকসজ্জার পাশাপাশি উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।প্রকাশ কুন্ডু আরও জানান, সম্প্রতি কলকাতায় দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তাঁদের পুজো কমিটি। দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো, সুষ্ঠুভাবে পুজো দর্শন এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে এ বছর আরও বেশি সজাগ থাকার চেষ্টা করা হবে। আনন্দ ও উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাঁদের অন্যতম দায়িত্ব বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।তিনি বলেন, দর্শনার্থীদের বিনোদন ও আনন্দের জন্য যা যা প্রয়োজন, তা করার চেষ্টা করা হবে। কালিয়াগঞ্জ শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকার সমস্ত মানুষকে তাঁদের পুজো প্রাঙ্গণে এসে প্রতিমা দর্শন এবং গ্রামবাংলার ঐতিহ্যভিত্তিক থিম উপভোগ করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি।বুধবার খুঁটিপুজোর মধ্য দিয়ে মহেন্দ্রগঞ্জ রায় কলোনি শ্রীশ্রী শ্যামাপুজোর আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হয়। খুঁটিপুজোকে কেন্দ্র করে পুজো কমিটির সদস্যদের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা। এ দিনের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই শুরু হয়ে গেল এ বছরের পুজোকে ঘিরে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথচলা।সব মিলিয়ে, এ বছর মহেন্দ্রগঞ্জ রায় কলোনির শ্যামাপুজোয় একদিকে যেমন থাকছে গ্রামবাংলার পরিবেশ ও ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’-এর বর্ণময় থিম, অন্যদিকে তেমনই রয়েছে প্রিয় বড় ভাইদার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের আবেগ। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শিল্পভাবনা এবং নিরাপত্তার সমন্বয়ে এবারের পুজো দর্শনার্থীদের কতটা আকর্ষণ করতে পারে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে কালিয়াগঞ্জবাসী।
