পালা বদলেছে, সরকার বদলেছে—তবু কালিয়াগঞ্জে দুর্নীতির অভিযোগে কেন নীরবতা?

তন্ময় চক্রবর্তী  :-রাজ্যে পালাবদলের পর নতুন সরকার প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনার পাশাপাশি আগের সরকারের আমলে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে—এমনই দাবি শাসক শিবিরের। রাজ্যের বিভিন্ন পৌরসভা, পঞ্চায়েত এবং প্রশাসনিক স্তরে অনিয়মের অভিযোগ সামনে এলে তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের কথাও শোনা যাচ্ছে।

কোথাও পৌরপ্রধান, কোথাও পঞ্চায়েতের প্রধান কিংবা পঞ্চায়েত সমিতির নেতৃত্বকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ নিয়ে তদন্তের পথেও এগোচ্ছে প্রশাসন।কিন্তু উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জে যেন ছবিটা অনেকটাই আলাদা। এখানেই এখন উঠছে একের পর এক প্রশ্ন।দীর্ঘদিন কালিয়াগঞ্জের পঞ্চায়েত সমিতি এবং পৌরসভা তৃণমূল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় বিভিন্ন প্রকল্প, উন্নয়নমূলক কাজ, আর্থিক লেনদেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে একাধিক অভিযোগ তুলেছিল তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপি।

 

রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক বৈঠকেও সেই অভিযোগ নিয়ে সরব হতে দেখা গিয়েছিল বিজেপি নেতৃত্বকে।কিন্তু পালাবদলের পর সেই একই অভিযোগগুলির কী হল?ক্ষমতার পরিবর্তনের কয়েক মাস কেটে গেলেও কালিয়াগঞ্জে বিগত পৌরবোর্ড কিংবা পঞ্চায়েত সমিতির আমলে ওঠা অভিযোগগুলির তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে এখনও বড় কোনও প্রকাশ্য রিপোর্ট সামনে আসেনি—এমনটাই দাবি স্থানীয়দের একাংশের।ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে—বিরোধী থাকার সময় বিজেপি যে অভিযোগগুলিকে এতটা গুরুত্ব দিয়েছিল, ক্ষমতায় আসার পর সেই অভিযোগগুলির তদন্তে দৃশ্যমান পদক্ষেপ কোথায়?

 

কালিয়াগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে এখন এই প্রশ্নও ঘুরছে—বিরোধী থাকার সময় যে সমস্ত অভিযোগকে সামনে রেখে তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল বিজেপি, সেগুলির কতটা সত্যি ছিল এবং কতটা ছিল রাজনৈতিক অভিযোগ?যদি অভিযোগগুলি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত কোথায়?

 

আর যদি অভিযোগগুলির কোনও ভিত্তিই না থাকে, তাহলে বিরোধী থাকার সময় সেই অভিযোগগুলি কেন এত জোরালোভাবে তোলা হয়েছিল?সাধারণ মানুষের একাংশের বক্তব্য, “অভিযোগ সত্যি হলে তদন্ত হোক, আর মিথ্যা হলে সেটাও পরিষ্কার করে জানানো হোক। মানুষকে অন্ধকারে রেখে দেওয়া কেন?”শুধু পৌরসভা কিংবা পঞ্চায়েত সমিতি নয়, কালিয়াগঞ্জের তৃণমূলের এক প্রভাবশালী নেতাকে ঘিরে চাকরি সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।কিন্তু পালাবদলের পর সেই অভিযোগের ক্ষেত্রেও বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে দৃশ্যমানভাবে নতুন করে তদন্তের দাবি বা আন্দোলন চোখে পড়ছে না—এমন অভিযোগও উঠছে।ফলে প্রশ্ন উঠছে, এখানেও কি তাহলে রাজনৈতিক সমঝোতার কোনও সমীকরণ কাজ করছে?অবশ্য এই সমস্ত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তই একমাত্র পথ বলে মনে করছেন সাধারণ মানুষ।পালা বদলের পরও পুরনো অভিযোগগুলি নিয়ে কোনও বড়সড় তদন্তের খবর প্রকাশ্যে না আসায় কালিয়াগঞ্জের বিভিন্ন মহলে এখন কানাঘুষো শুরু হয়েছে।“তাহলে কি তৃণমূল-বিজেপির মধ্যে তলে তলে কোনও বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছে?”এমন প্রশ্নই এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।যদিও রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনও ধরনের ‘সেটিং’ হয়েছে—এমন কোনও প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। ফলে বিষয়টি আপাতত জনমনে ওঠা প্রশ্ন এবং রাজনৈতিক জল্পনা হিসেবেই রয়েছে।কালিয়াগঞ্জের সাধারণ মানুষের দাবি খুব স্পষ্ট—বিগত সরকারের আমলে যদি কোনও প্রকল্পে দুর্নীতি, অনিয়ম বা আর্থিক বেনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। তদন্তে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।অন্যদিকে তদন্তে যদি অভিযোগের কোনও সত্যতা না মেলে, তাহলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা প্রকাশ্যে জানানো হোক।কারণ, দুর্নীতির অভিযোগ ঝুলিয়ে রেখে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগ তোলাও গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর।কালিয়াগঞ্জে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—বিরোধী থাকার সময় বিজেপি যে সমস্ত অভিযোগ তুলেছিল, ক্ষমতায় এসে সেগুলির কতগুলি নিয়ে তদন্ত হয়েছে? কতগুলি অভিযোগের সত্যতা মিলেছে? আর কতগুলি অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে?সেই হিসাব কি প্রকাশ্যে আসবে?নাকি পালাবদলের পর রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো অভিযোগগুলিও ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যাবে?এই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছেন কালিয়াগঞ্জের সাধারণ মানুষ।স্বচ্ছতার কথা যদি সত্যিই বলা হয়, তাহলে কালিয়াগঞ্জের পুরনো অভিযোগগুলিরও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তার রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসুক—এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।