“জাল লটারির জাল বিস্তার কালিয়াগঞ্জে—পুলিশের জালে ৩, অধরাই ‘মাস্টারমাইন্ড’”

তন্ময় চক্রবর্তী :-উত্তরদিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ শহর ও সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই চলছে নিষিদ্ধ ও জাল ‘ডিয়ার’ লটারির রমরমা কারবার। অবশেষে এই চক্রের সন্ধানে নেমে মঙ্গলবার রাতে কালিয়াগঞ্জ রেলস্টেশন চত্বর থেকে তিন লটারি বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। ধৃতদের নাম অভিজিৎ সাহা, নান্টু সাহা ও সঞ্জয় সিং।

বুধবার ধৃতদের রায়গঞ্জ জেলা আদালতে পেশ করা হয়েছে। তবে পুলিশের এই অভিযানে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্তোষের চেয়ে প্রশ্নই দানা বেঁধেছে বেশি।পুলিশি অভিযানে তিন বিক্রেতা ধরা পড়লেও তারা আদতে এই বিশাল কারবারের সামান্য কয়েকটা ‘ঘুঁটি’ মাত্র।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পেটের দায়ে যারা ফুটপাতে বা রাস্তার ধারে টেবিল পেতে লটারি বিক্রি করেন, তাদের গ্রেপ্তার করে এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা অসম্ভব। কালিয়াগঞ্জের জাল লটারি সাম্রাজ্যের আসল নিয়ন্ত্রক বা ‘মূল পাণ্ডারা’ এখনও পুলিশের নাগালের বাইরে।

গুঞ্জন রয়েছে, এই অসাধু ব্যবসার পেছনে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়াই মূল ঢাল হিসেবে কাজ করছে।কালিয়াগঞ্জ শহর ছাড়িয়ে এখন গ্রামের আনাচে-কানাচেও এই কারবার ছড়িয়ে পড়েছে। যে সমস্ত এলাকায় প্রকাশ্যেই এই জাল লটারি  শহর এলাকা: রেলস্টেশন চত্বর, মহেন্দ্রগঞ্জ, শিমুলতলা।গ্রামীণ এলাকা: বাঘন চেকপোস্ট মোড়, কুনোর, তরঙ্গপুর, ধনকৈল।অভিযোগ উঠেছে, এনফোর্সমেন্ট শাখার দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়েই এই চক্র এখন ‘খুল্লাম খুল্লা’ তাদের কারবার চালাচ্ছে। প্রতিদিন কয়েক লক্ষ টাকার এই অবৈধ কারবার এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীকে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

 

এই জাল লটারির কারবারের ফলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রতিদিন কয়েক লক্ষ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। লটারির মূল টিকিটের আদলেই ছাপানো হচ্ছে এই জাল টিকিট, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে চেনা প্রায় অসম্ভব। ফলে পুরস্কারের আশায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ এই মরীচিকার পেছনে ঢালছেন, আর দিনশেষে প্রতারিত হচ্ছেন।শহরের সচেতন মহলের দাবি, পুলিশ যদি সত্যিই জাল লটারির কারবার বন্ধ করতে চায়, তবে কেবল চুনোপুঁটি ধরলে হবে না। রাঘববোয়ালদের অর্থাৎ যারা এই জাল টিকিট ছাপানো এবং বন্টনের দায়িত্বে রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে।

 

রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে মূল পাণ্ডাদের গ্রেপ্তার না করলে কালিয়াগঞ্জ থেকে লটারি দুর্নীতির এই শিকড় উপড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়রাতারাতি ভাগ্য বদলানোর নেশা নাকি চরম সর্বনাশ? জেলার কালিয়াগঞ্জ শহর ও সংলগ্ন গ্রামগুলোতে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। সরকারি অনুমোদিত লটারির আড়ালে কালিয়াগঞ্জ জুড়ে জাঁকিয়ে বসেছে অবৈধ ‘জাল’ লটারি বা স্থানীয় ভাষায় যাকে বলা হচ্ছে ‘ঝাল ঝিলি’। বিনা পরিশ্রমে অর্থ উপার্জনের এই মরণফাঁদে পা দিয়ে প্রতিদিন নিঃস্ব হচ্ছেন শয়ে শয়ে সাধারণ মানুষ।

 

সাংকেতিক কোডেই লুকিয়ে জালিয়াতির রহস্যঅনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, কালিয়াগঞ্জে আসল লটারিকে টেক্কা দিয়ে রমরমিয়ে চলছে এই জাল লটারির ব্যবসা। এই লটারি চেনার একমাত্র উপায় হলো টিকিটে থাকা বিশেষ কিছু ‘সাংকেতিক কোড’। লটারি নম্বরগুলোর পাশে SM, , ML1, SN, RG4, SN9, RL, NL-এর মতো কোড ব্যবহার করে অসাধু ব্যবসায়ীরা এই কারবার চালাচ্ছে।সাধারণ মানুষের বোঝার উপায় নেই কোনটি আসল আর কোনটি জাল।​কোথায় চলছে এই সূত্রের খবর অনুযায়ী, কালিয়াগঞ্জ-এর বাঘন বটতলীতে একটি মিষ্টির দোকানের আড়ালেই নাকি চলছে এই জাল কারবারের মূল ঘাঁটি। শুধু তাই নয়, ধনকলের শান্তি কলোনি থেকেও প্রতিদিন গভীর রাতে কালো কাচ লাগানো গাড়িতে করে এই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারকে কাজে লাগিয়ে কালিয়াগঞ্জের একাধিক পাইকারের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে জাল লটারির চালান।

 

সূত্র আরও জানাচ্ছে, এই অবৈধ ব্যবসার শিকড় ছড়িয়ে পড়েছে ফতেপুর ও চান্দোল এলাকাতেও, যেখানে রমরমিয়ে চলছে এই কারবার। পাশাপাশি কালিয়াগঞ্জের ধনকৈল, বীরগই, পূর্ব তরঙ্গপুর এবং পার্শ্ববর্তী হেমতাবাদ ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকায় জাল লটারির জাল ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে।সব মিলিয়ে, বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই অবৈধ লটারি চক্রের দৌরাত্ম্য বাড়ছে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।। মাঝে মধ্যে পুলিশি তৎপরতায় কিছুদিন বন্ধ থাকলেও, অল্পদিন পরেই ফের স্বমহিমায় ফিরছে এই অবৈধ ব্যবসা। অনেক জায়গায় টেবিল পেতে প্রকাশ্যে এই টিকিট বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। কোনো টিকিটের দাম ৬০ টাকা, আবার কোনোটির দাম ১২০ টাকা।​পুরস্কারের টোপ ও রাজস্ব ফাঁকি​জানা গিয়েছে, এই লটারিগুলোতে সরকার স্বীকৃত লটারির তুলনায় পুরস্কার মূল্য অনেক কম দেওয়া হয়। অথচ সাধারণ মানুষ অতিরিক্ত লাভের আশায় এবং কম সময়ে বেশি টাকা পাওয়ার লোভে এই ফাঁদে পা দিচ্ছেন।

 

সম্পূর্ণ অবৈধভাবে চলায় সরকার এখান থেকে কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না, ফলে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে রাজ্য সরকার। অন্যদিকে, সরকারি লটারির বিক্রিও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।​বিপর্যস্ত জনজীবন ও পারিবারিক অশান্তি​এই লটারির নেশা কেবল পকেটই খালি করছে না, ভাঙন ধরাচ্ছে পরিবারেও। লটারির পেছনে প্রতিদিন টাকা নষ্ট করার ফলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে অশান্তি এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেরই অভিযোগ, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর পকেট ভরাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ ভিটেমাটি হারানোর উপক্রম হচ্ছে।​স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রশাসনের উচিত দ্রুত এই জাল লটারির ডেরাগুলোতে হানা দিয়ে মূল পান্ডাদের গ্রেফতার করা। নাহলে এই ‘সর্বনাশা নেশা’ কালিয়াগঞ্জের বহু পরিবারকে চিরতরে পথে বসিয়ে দেবে।