কালিয়াগঞ্জে এবার কি ‘মহারাজ’ ম্যাজিক? সৌমেন রায়ের টিকিট না পাওয়া ও বিজেপির নয়া সমীকরণ নিয়ে তোলপাড় কালিয়াগঞ্জ
তন্ময় চক্রবর্তী উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে রাজনীতির হাওয়া এবার কোন দিকে? গতবারের জয়ী প্রার্থী সৌমেন রায়ের ‘দলবদল’ বনাম বিজেপির নতুন মুখ উৎপল মহারাজের ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তি’— এই দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে এখন কালিয়াগঞ্জের ভোট-রাজনীতি। গত কয়েক বছর ধরে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা কালিয়াগঞ্জবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন, তার জবাব কি ইভিএম-এ মিলবে?

এই প্রশ্নই এখন কালিয়াগঞ্জের প্রতিটি গ্রাম ও গঞ্জের মোড়ে মোড়ে ঘুরপাক খাচ্ছে।সৌমেন রায়ের টিকিট না পাওয়া: ক্ষোভ না কি ড্যামেজ কন্ট্রোল?একুশের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর সৌমেন রায়ের তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেওয়া এবং ফের বিজেপিতে ফিরে আসা— এই ঘটনাক্রম সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনাস্থা তৈরি করেছিল। রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের সেই ক্ষোভের আঁচ পেয়েই এবার আর সৌমেন রায়কে টিকিট দেওয়ার ঝুঁকি নেয়নি গেরুয়া শিবির। দল বদলের ইতিহাসের কারণে বিজেপির ওপর যে আস্থার অভাব তৈরি হয়েছিল, তা ঢাকতেই কি এবার টিকিট ‘কাটা’ গেল? কালিয়াগঞ্জ কুর্নর শাখার ভারত সেবাশ্রম সংঘের সঙ্গে যুক্ত উৎপল মহারাজকে প্রার্থী করে বিজেপি কি ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে চাইছে?উৎপল মহারাজ: বিজেপির তুরুপের তাস না কি নতুন চ্যালেঞ্জ?উৎপল মহারাজ এলাকায় একজন সুপরিচিত এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। কালিয়াগঞ্জ কুর্নর শাখার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে মানুষের সঙ্গে তাঁর একটা আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। বিজেপির এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘ক্লিন ইমেজ’ বা স্বচ্ছ ভাবমূর্তির রাজনীতি হিসেবে দেখছেন। তবে প্রশ্ন উঠছে, আধ্যাত্মিক জগত থেকে রাজনীতির ময়দানে পা রাখা এই মহারাজের পক্ষে কি সম্ভব হবে পোড় খাওয়া রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করা?সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া: “ভক্তি এক জিনিস, ভোট অন্য”কালিয়াগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ডালিমগাঁ এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “মহারাজ ভালো মানুষ, শ্রদ্ধা করি। কিন্তু এলাকার রাস্তাঘাট, আলো আর পানীয় জলের সমস্যার সমাধান কে করবে? সৌমেন বাবু যে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি শুনিয়েছিলেন, তার অনেক কাজই হয়নি। এবার আমরা প্রতিশ্রুতি নয়, কাজ দেখে ভোট দেবো।”আবার অন্য একদল ভোটারের মতে, সৌমেন রায়ের বারবার দল বদলে মানুষ বীতশ্রদ্ধ ছিল। সেখানে উৎপল মহারাজের মতো একজন প্রার্থী মানুষের হারানো ভরসা কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনতে পারে। তবে বিজেপির ‘ওভার কনফিডেন্স’ নিয়ে এখনও মানুষের মধ্যে সংশয় কাটেনি।
প্রতিশ্রুতির পাহাড় বনাম বাস্তবের মাটিগতবার বিজেপি নির্বাচনের আগে যে ইস্তাহার প্রকাশ করেছিল, তার অনেক অংশই অধরা থেকে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিশেষ করে কর্মসংস্থান ও এলাকার স্থায়ী উন্নয়নের অভাব। এবারের নির্বাচনে বিজেপি যদি কেবল ‘মহারাজ কার্ড’ খেলে জিততে চায়, তবে তা বুমেরাং হতে পারে। গ্রামের মানুষেরা এখন উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ চাইছে।
বিজেপির সামনে কঠিন পরীক্ষা কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা একসময় কংগ্রেসের দুর্গ ছিল, পরে তা বিজেপির দখলে আসে। এবার সেই জমি ধরে রাখা বিজেপির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। সৌমেন রায়ের বদলে উৎপল মহারাজকে আনা বিজেপির একটি মাস্টারস্ট্রোক হতে পারে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে যে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে, তা মুছে ফেলা কি এত সহজ?কালিয়াগঞ্জের গ্রামে গ্রামে এখন একটাই গুঞ্জন— বিজেপি কি এবারও সেই পুরনো প্রতিশ্রুতির ঘেরাটোপে আটকে থাকবে, না কি ‘মহারাজ’-এর নেতৃত্বে নতুন কোনো পথ দেখাবে? মানুষের ক্ষোভ এবং প্রত্যাশার মাঝে দাঁড়িয়ে কালিয়াগঞ্জ বিধানসভার এই নির্বাচন এবার ঐতিহাসিক হতে চলেছে।

