আধুনিকতার ঝড়ে হারিয়ে যাচ্ছে তালপাতার হাতপাখা! ৫০ বছর ধরে ঐতিহ্য আঁকড়ে অনিল, সরকারি সহায়তার আশায় শিল্পী পরিবার
তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ, ২২ আগস্ট:
এক সময় গ্রামবাংলার গরমের দিনে মানুষের অন্যতম ভরসা ছিল তালপাতার হাতপাখা। দুপুরের দাবদাহে উঠোনে বসে তালপাতার পাখার বাতাস, কিংবা সন্ধ্যায় হারিকেনের আলোয় পাখা নাড়তে নাড়তে গল্পের আসর—তালপাতার হাতপাখার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রামবাংলার এক টুকরো নস্টালজিয়া ও ঐতিহ্য। কিন্তু সময় বদলেছে। বিদ্যুতের প্রসার, বৈদ্যুতিক পাখা, কুলার ও এয়ার কন্ডিশনের দাপটে সেই তালপাতার হাতপাখা আজ প্রায় অস্তিত্ব সংকটে।এক সময় গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্রই ছিল তালপাতার হাতপাখার কদর। পুজো-পার্বণ থেকে শুরু করে গৃহস্থের নিত্যদিনের কাজে ব্যবহার হতো এই পাখা। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গিয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা। ফলে কমেছে চাহিদা, বন্ধ হয়েছে বহু পরিবারের ঐতিহ্যবাহী পেশা। প্লাস্টিক ও নানা আধুনিক উপকরণের তৈরি হাতপাখাও বাজার দখল করায় আরও পিছিয়ে পড়েছে তালপাতার পাখা।তবে এই কঠিন সময়েও উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ শহরের ধনকোল এলাকার বৈশ্যপাড়ায় কোনওরকমে সেই পুরনো শিল্পকে আঁকড়ে ধরে রয়েছেন অনিল বৈশ্য ও তাঁর পরিবার। প্রায় ৪৫-৫০ বছর ধরে তালপাতার হাতপাখা তৈরির সঙ্গে যুক্ত অনিল এখনও বাপ-ঠাকুরদার আমলের এই পেশা ছাড়েননি।

দিনরাত স্বামীর পাশে স্ত্রী
তালপাতার পাখা তৈরির কাজে অনিল বৈশ্যকে দীর্ঘদিন ধরে সাহায্য করে চলেছেন তাঁর স্ত্রীও। একসময় যে কাজ ছিল পরিবারের প্রধান জীবিকার অন্যতম মাধ্যম, বর্তমানে সেই কাজই টিকে রয়েছে অনেকটা ভালোবাসা ও ঐতিহ্যের টানে। চাহিদা কমে গেলেও পুরনো পেশাটিকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারেননি তাঁরা।অনিল বৈশ্য জানান, এক সময় প্রতিদিন প্রায় ১০০টি পর্যন্ত তালপাতার হাতপাখা তৈরি করতেন তিনি। যাঁদের প্রয়োজন হতো, তাঁরা বাড়ি থেকেই পাখা নিয়ে যেতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই চাহিদা আর নেই। ফলে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে এসেছে এই শিল্পের পরিসর।এই পাখা তৈরি করতে শুধু পাতা সংগ্রহ করলেই হয় না। তালগাছে উঠে তালপাতা সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে পাতার উপযুক্ত অংশ বাছাই, শুকানো, কাটা এবং কাঠামো তৈরি—প্রতিটি ধাপেই রয়েছে শ্রম ও ঝুঁকি। অনিলের কথায়, দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করতে গিয়ে তাঁকে বহুবার বিপদের মুখেও পড়তে হয়েছে।
নতুন প্রজন্ম আসছে না, হারিয়ে যাচ্ছে কারিগরি দক্ষতা
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, এই শিল্পে নতুন প্রজন্মের কারিগর তৈরি হচ্ছে না। পেশাদার বহু কারিগর ইতিমধ্যেই তালপাতার পাখা তৈরির কাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে গিয়েছেন। কারণ, এই শিল্প থেকে বর্তমানে পর্যাপ্ত আয় হয় না। ফলে বংশপরম্পরায় চলে আসা কারিগরি দক্ষতাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
কালিয়াগঞ্জ পুড়িয়া-মহেশপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুমিত মজুমদার বলেন, বর্তমানে তালপাতার হাতপাখার ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে অধিকাংশ পেশাদার কারিগর বাধ্য হয়ে তাঁদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে অন্য জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এর ফলে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে এই শিল্পসত্তা। নতুন প্রজন্মের কারিগরও তৈরি হচ্ছে না।
‘তালপাখা ছিল গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক’
কালিয়াগঞ্জ শহরের বিশিষ্ট কবি রাজকুমার জাজদিয়া বলেন, তালপাতার হাতপাখা একসময় গ্রামীণ ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক ছিল। এই শিল্পকে ঘিরে একসময় মানুষের গর্ব ছিল। কিন্তু বৈদ্যুতিক পাখা, কুলার ও এয়ার কন্ডিশনের মতো আধুনিক সরঞ্জাম বাজারে সহজলভ্য হওয়ায় তালপাতার হাতপাখার চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছে।
সরকারি সহায়তার দাবি শিল্পীর
তালপাতার হাতপাখা শিল্পী অনিল বৈশ্যের আক্ষেপ, কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত এই প্রাচীন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, কুটির শিল্প দপ্তর থাকলেও এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের পাশে দাঁড়াতে কার্যকর উদ্যোগ এখনও চোখে পড়েনি।
অনিল বৈশ্য বলেন, রাজ্যে সরকারের পরিবর্তন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাঁদের মতো ক্ষুদ্র ও প্রাচীন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষরা এখনও পর্যাপ্ত সহায়তা থেকে বঞ্চিত। তাঁর আশা, নতুন সরকার যদি তালপাতার হাতপাখার মতো হারিয়ে যেতে বসা কুটির শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে উদ্যোগী হয়, তাহলে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে এই শিল্প। বাঁচতে পারেন এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলিও।
ঐতিহ্য বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ জরুরি
তালপাতার হাতপাখা শুধু একটি সামগ্রী নয়, এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ঐতিহ্য। বাজারে এর চাহিদা কমলেও পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক উপকরণে তৈরি এই শিল্পকে নতুনভাবে বাজারজাত করা গেলে এর পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে।
কালিয়াগঞ্জের বৈশ্যপাড়ায় অনিল বৈশ্যের পরিবার এখনও সেই পুরনো ঐতিহ্যের প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে। কিন্তু সরকারি সহায়তা, বাজার তৈরি এবং নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা না গেলে হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে গ্রামবাংলার সেই চিরচেনা তালপাতার হাতপাখা।

