শ্রাবণ শেষ, তবুও থামেনি কলকির চাহিদা! উত্তর দিনাজপুরের কুনোরের টেরাকোটা গ্রামে মাটির কলকির ব্যস্ততা—স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে পাড়ি দিচ্ছে বিহারেও

তন্ময় চক্রবর্তী , উত্তর দিনাজপুর: শ্রাবণ মাস শেষ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু উত্তর দিনাজপুরের কুনোরের টেরাকোটা গ্রামে এখনও যেন কাটেনি কলকির মরশুম। সকাল হতেই মাটির দলা, জল আর কারিগরের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় একের পর এক তৈরি হচ্ছে মাটির কলকি। উঠোন থেকে কারিগরের ঘর—সব জায়গাতেই এখন ব্যস্ততার ছবি।

কোথাও মাটি প্রস্তুত করা হচ্ছে, কোথাও তৈরি হচ্ছে কলকির কাঠামো, আবার কোথাও রোদে শুকোতে দেওয়া হয়েছে সারি সারি তৈরি কলকি।কুনোরের এই টেরাকোটা গ্রাম বহুদিন ধরেই মাটির শিল্পকর্মের জন্য পরিচিত। এখানকার শিল্পীদের হাতের কাজ শুধু উত্তর দিনাজপুরের স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই। জেলার বিভিন্ন হাট–বাজারের পাশাপাশি কুনোরের তৈরি মাটির কলকি এখন পাড়ি দিচ্ছে প্রতিবেশী রাজ্য বিহারেও। বিশেষ করে বিভিন্ন পুজো–পার্বণ ও লোকাচারকে ঘিরে এই মাটির সামগ্রীর চাহিদা তৈরি হওয়ায় কারিগরদের ব্যস্ততাও বেড়েছে।

 

সাধারণত শ্রাবণ মাসকে ঘিরে মাটির কলকির চাহিদা বাড়তে দেখা যায়। কিন্তু এবছর শ্রাবণ শেষ হওয়ার পরেও সেই চাহিদায় বিশেষ ভাটা পড়েনি বলে জানাচ্ছেন কুনোরের টেরাকোটা শিল্পীরা। স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বাইরের ব্যবসায়ীরাও কলকির জন্য যোগাযোগ করছেন। ফলে আগেভাগেই তৈরি করে রাখতে হচ্ছে প্রচুর পরিমাণে মাটির কলকি।কারিগরদের কথায়, পুজো–পার্বণের মরশুম সামনে আসতেই নতুন করে অর্ডার আসতে শুরু করেছে। স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বিহারের বিভিন্ন জায়গাতেও এই সামগ্রী যাচ্ছে।

ফলে একদিকে যেমন শিল্পীদের হাতে কাজ রয়েছে, তেমনই অন্যদিকে তাঁদের তৈরি মাটির শিল্পকর্ম ছড়িয়ে পড়ছে জেলার সীমানা পেরিয়ে।চোখের সামনে মাটির সাধারণ একটি দলা কীভাবে ধীরে ধীরে কলকির রূপ নেয়, কুনোরের টেরাকোটা গ্রামে দাঁড়ালে সেই দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে। নিপুণ হাতে মাটিকে আকার দেওয়া, শুকিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলা—প্রতিটি ধাপেই রয়েছে শিল্পীর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা।এই কাজ শুধু জীবিকা নয়, বহু পরিবারের কাছে এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ঐতিহ্য।

 

মাটির সঙ্গে সম্পর্ক, হাতের কাজের দক্ষতা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধনেই তৈরি হচ্ছে কুনোরের টেরাকোটা শিল্পের আলাদা পরিচয়।কুনোরের তৈরি মাটির কলকি এখন শুধু আশপাশের বাজারে বিক্রি হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের হাত ধরে তা পৌঁছে যাচ্ছে বিহারের বিভিন্ন এলাকাতেও।

 

পুজো–পার্বণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সামগ্রীর চাহিদা বাড়ায় এই মাটির পণ্যের বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে।কারিগরদের আশা, এভাবে বাইরের বাজারে চাহিদা আরও বাড়লে কুনোরের টেরাকোটা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির আয়ও বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরাও এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহিত হবে।

আজকের দিনে মেশিনে তৈরি নানা সামগ্রীর ভিড়ে হাতে তৈরি মাটির সামগ্রীর আলাদা কদর রয়েছে। তার সঙ্গে যদি যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, শিল্পীর হাতের নিপুণতা এবং গ্রামীণ জীবনের গল্প—তাহলে সেই পণ্যের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।কুনোরের টেরাকোটা গ্রামের মাটির কলকি তাই শুধু একটি মাটির সামগ্রী নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একদল শিল্পীর জীবন-জীবিকা,

 

পরিশ্রম এবং বংশপরম্পরায় চলে আসা মৃৎশিল্পের ঐতিহ্য।শ্রাবণ পেরিয়ে ভাদ্র এসেছে, সামনে পুজোর মরশুম। আর সেই কারণেই কুনোরের টেরাকোটা গ্রামে এখন থামার সময় নেই। চাকার ঘূর্ণন, মাটির গন্ধ আর শিল্পীর হাতের নিপুণতায় তৈরি হয়ে চলেছে একের পর এক কলকি। স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে সেই মাটির শিল্প এখন পাড়ি দিচ্ছে বিহারেও।

 

মাটির তৈরি এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের চাহিদা যদি এভাবেই বজায় থাকে, তবে কুনোরের টেরাকোটা গ্রামের শিল্পীদের মুখে আরও একটু স্বস্তির হাসি ফুটবে—এমনটাই আশা করছেন কারিগর ও স্থানীয় মানুষজন।কুনোরের টেরাকোটা শিল্পী আক্রোশ রায় বলেন, “শ্রাবণ মাসে কলকির চাহিদা বেশি থাকে ঠিকই, কিন্তু শ্রাবণ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও এবছর কলকির অর্ডার কমেনি।

 

স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিহার থেকেও কলকির চাহিদা আসছে। বিভিন্ন পুজো-পার্বণ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য এই মাটির সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তাই এখন আমাদের কাজের চাপ অনেকটাই বেশি।”

তিনি আরও বলেন, “মাটি সংগ্রহ থেকে শুরু করে কলকি তৈরি, শুকানো এবং পোড়ানো—প্রতিটি কাজেই অনেক সময় ও পরিশ্রম লাগে। আমাদের কাছে এটা শুধু ব্যবসা নয়, বংশপরম্পরায় চলে আসা শিল্প। এই শিল্পের উপর অনেকগুলি পরিবার নির্ভরশীল। যদি কলকির মতো মাটির সামগ্রীর চাহিদা আরও বাড়ে এবং শিল্পীরা ভালো দাম পান, তাহলে আগামী প্রজন্মও এই কাজের প্রতি আগ্রহী হবে।”

আক্রোশ রায়ের কথায়, “কুনোরের মাটির কাজ এখন শুধু আমাদের এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাইরে থেকেও মানুষ এই কাজের খোঁজ করছেন। আমাদের তৈরি সামগ্রী বিহারেও যাচ্ছে—এটাই আমাদের কাছে গর্বের বিষয়।”