মৃত’ মানুষের সংসার যুদ্ধ! সরকারি খাতায় বন্ধ শ্বাস, আধার কার্ডেই আটকে জ্যান্ত সুশীলার জীবন

প্রতিদিনের মতোই সকালে উঠে সংসারের সমস্ত হাঁড়িকুড়ি সামলানো, রান্নাবাটি করা, হেঁটে হেঁটে পাড়ায় যাওয়া-আসা—সবই করছেন একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতো। অথচ সরকারি নথিপত্রের ঠান্ডা ঘরে তিনি আজ ‘মৃত’! হ্যাঁ, নথির পরিভাষায় তিনি আর জীবিত নেই। সরকারি কম্পিউটারে তাঁর আধার বিবরণী পরীক্ষা করলেই স্ক্রিনে ফুটে উঠছে—”মৃত”।

বাস্তব আর সরকারি কাগজের এই অদ্ভুত ও মর্মান্তিক বৈপরীত্যের শিকার উত্তর দিনাজপুর জেলার হেমতাবাদ ব্লকের কলোনি পাড়ার বাসিন্দা সুশীলা বারুই।এক-দুই দিন নয়, বিগত দীর্ঘ তিন বছর ধরে এক জীবিত নারী নিজেকে ‘জীবিত’ প্রমাণ করতে দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন। কিন্তু প্রশাসনের লোহার দরজা তাঁর এই বাস্তব উপস্থিতিকে স্বীকার করতে নারাজ!একটি ভুয়ো ডেথ সার্টিফিকেট ও থমকে যাওয়া জীবনহেমতাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েত দফতরে গিয়ে সুশীলা দেবী জানতে পারেন, এক অজানা ষড়যন্ত্র বা জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁর আধার বিবরণী ব্যবহার করে কেউ বা কারা তৈরি করে নিয়েছে তাঁরই একটি ‘মৃত্যু সনদ’ (Death Certificate)! সেই একটি ভূয়ো কাগজের মাসুল এখন গুনতে হচ্ছে গোটা পরিবারকে।সরকারি খাতায় মৃত তালিকাভুক্ত হওয়ায় এক নিমেষে বন্ধ হয়ে গিয়েছে:রেশন ও রান্নার গ্যাসের সংযোগ ,সমস্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট,’লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর মতো রাজ্য সরকারের জনমুখী সামাজিক সুরক্ষা ভাতাচিকিৎসাও আটকে আধার-জালে!সমস্যার এখানেই শেষ নয়, বর্তমানে সুশীলা দেবী গুরুতর অসুস্থ। কিন্তু তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন স্বজনরা। কারণ, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় আধার বিবরণী দেওয়া মাত্রই কম্পিউটার জানান দিচ্ছে রোগী ‘মৃত’। ফলে জীবিত মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করা নিয়ে তৈরি হচ্ছে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা।সুশীলা দেবীর ছেলে সুজিত বারই ক্ষোভ ও হাহাকার উগরে দিয়ে জানান—”গ্রাম পঞ্চায়েত, হেমতাবাদ বিডিও অফিস থেকে শুরু করে জেলাশাসক (DM) এবং পুলিশ সুপার (SP)—কাউকে জানাতে বাকি রাখিনি। কিন্তু তিন বছর কেটে গেলেও কেউ আমার মাকে জীবিত ঘোষণা করতে পারল না! চিকিৎসাটুকু পর্যন্ত করাতে পারছি না।”ইতিমধ্যেই এই চাঞ্চল্যকর বিষয়ে হেমতাবাদ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন সুশীলা দেবী। ঘটনার গুরুত্ব স্বীকার করে স্থানীয় হেমতাবাদ গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্য বিপ্লব সরকার চাঁচাছোলা ভাষায় আক্রমণ করেছেন প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে। তাঁর অভিযোগ, বিগত দিনে নিয়ম-নীতি তোয়াক্কা না করে অসাধু চক্রের মাধ্যমে যেভাবে অগণিত জন্ম-মৃত্যু সনদ বের করা হয়েছে, সুশীলা দেবী তারই বলি। এই জালিয়াতি চক্রের মূল পাণ্ডাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।জীবন্ত একজন মানুষের স্বাভাবিক অস্তিত্বকে আধার কার্ডের একটি ভুল তথ্যে এভাবে মুছে ফেলার ঘটনা শুধুই এক সুশীলা দেবীর বিপর্যয় নয়, বরং সমগ্র ডিজিটাল প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিই এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল! এখন দেখার, এই প্রতিবেদন ও আইনি পদক্ষেপের পর সুশীলা বারুই কি তাঁর ‘জীবিত’ পরিচয় ফেরত পাবে