ফেলে দেওয়া ভাসমান কাঠে ফুটে ওঠে জীবনের গল্প!অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিল্প সাধনায় দিলীপ দাস আজও কাজ করে চলেছে
তপন চক্রবর্তী,কালিয়াগঞ্জ ৬ আগস্ট: যে কাঠ একসময় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হতো বা ফেলে দেওয়া হতো, সেই পরিত্যক্ত কাঠই আজ শিল্পের অনন্য নিদর্শনে পরিণত হচ্ছে উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জের -শিক্ষক দিলীপ কুমার দাসের হাতে।


প্রকৃতির উপহারকে নিজের কল্পনা ও সৃজনশীলতার ছোঁয়ায় তিনি এমনভাবে রূপ দেন যে প্রতিটি কাঠের টুকরো যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়।দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের পাশাপাশি শিল্পচর্চাকে সমান গুরুত্ব দিয়েছেন দিলীপবাবু। প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদান যেমন উল্লেখযোগ্য, তেমনি অবসর জীবনে তিনি সম্পূর্ণভাবে মনোনিবেশ করেছেন কাঠের ভাস্কর্য ও প্রাকৃতিক শিল্পসৃষ্টিতে।
ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে এই অভিনব শিল্পধারার দিকে আকৃষ্ট করে।বন, নদী কিংবা চা-বাগান ঘুরে বেড়ানোর সময় তিনি সংগ্রহ করেন বিভিন্ন আকারের শুকনো কাঠ, গাছের শিকড়, ডাল ও গুঁড়ি। এরপর সেই কাঠের স্বাভাবিক গঠনকে অক্ষুণ্ণ রেখে খুব সামান্য কারুকার্যের মাধ্যমে সৃষ্টি করেন অসাধারণ শিল্পকর্ম। কোথাও ফুটে ওঠে মানুষের মুখাবয়ব, কোথাও পশু-পাখির অবয়ব, আবার কোথাও তৈরি হয় পৌরাণিক চরিত্র বা বিমূর্ত শিল্প।তাঁর তৈরি শিল্পকর্মের মধ্যে রয়েছে ‘সহায়’, ‘হ্যাপি ফ্যামিলি’, ‘মহামায়া’, ‘ক্রিকেটার’, ‘আউট ফর ডাক’, ‘হাতি’, ‘শিকারি’, ‘প্লাস্টিক-সুন্দরী’-সহ বহু উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি। প্রতিটি কাজেই রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং শিল্পবোধের এক অনন্য বার্তা।শুধু শিল্পী হিসেবেই নয়, নতুন প্রজন্মকে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতেও নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
বিভিন্ন বিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কর্মশালা পরিচালনা করে ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে-কলমে কাঠের শিল্পের প্রশিক্ষণ দেন। তাঁর বিশ্বাস, প্রযুক্তির যুগেও প্রকৃতিনির্ভর শিল্পচর্চা মানুষের সৃজনশীলতা ও পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।দিলীপ কুমার দাসের শিল্পকর্ম ইতিমধ্যেই বিভিন্ন প্রদর্শনী, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে প্রদর্শিত হয়েছে। তাঁর কাজের প্রশংসা করেছেন শিল্পপ্রেমী, শিক্ষাবিদ এবং সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ।
ভবিষ্যতে একটি স্থায়ী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলে এই শিল্পকে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।দিলীপবাবুর কথায়, “প্রকৃতি কখনও অপ্রয়োজনীয় কিছু সৃষ্টি করে না। মানুষের চোখে যে কাঠ পরিত্যক্ত, শিল্পীর চোখে সেটিই হতে পারে এক নতুন সৃষ্টির সূচনা।”পরিত্যক্ত কাঠকে শিল্পের ভাষায় নতুন জীবন দেওয়ার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আজ শুধু কালিয়াগঞ্জ নয়, সমগ্র উত্তর দিনাজপুরের গর্ব হয়ে উঠেছে। তাঁর সৃষ্টিশীলতার হাত ধরে পরিবেশবান্ধব শিল্পচর্চা নতুন প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠছে।
