ঐতিহ্যের স্বীকৃতির দাবি: ১৮৭৪ সালের কালিয়াগঞ্জ থানাকে ‘হেরিটেজ থানা’ ঘোষণার আর্জি ভারতীয় ইতিহাস সংকলন সমিতির
তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ, ২২ জুলাই:উত্তর দিনাজপুর জেলার প্রাচীন ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অন্যতম সাক্ষী ১৮৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কালিয়াগঞ্জ থানাকে ‘হেরিটেজ থানা’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানাল ভারতীয় ইতিহাস সংকলন সমিতি। সংগঠনের দাবি, শুধু জেলার নয়, গোটা উত্তরবঙ্গের পুলিশ প্রশাসনের ইতিহাসে কালিয়াগঞ্জ থানার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক থানাকে সংরক্ষিত ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।জানা যায়, বর্তমানে কালিয়াগঞ্জ শহরের ১০৩ নম্বর চকমজলিশপুর মৌজায় অবস্থিত এই থানা প্রথমে মুস্তাফানগর গ্রাম পঞ্চায়েতের হাট কালিয়াগঞ্জ এলাকায় ছিল।

পরে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে শ্রীমতী নদীর তীরে রায়গঞ্জ–বালুরঘাট রাজ্য সড়কের পাশে বর্তমান স্থানে থানাটি স্থানান্তরিত করা হয়।ব্রিটিশ আমলে নির্মিত থানার মূল ভবনটি এখনও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ১৫ ইঞ্চি পুরু ইট ও কাদার গাঁথুনির উপর চুন–বালির প্লাস্টারে নির্মিত বিশাল চৌচালা টিনের এই ভবনটি সেই সময়কার স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। দীর্ঘ দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভবনটি আজও ব্যবহৃত হচ্ছে এবং পুলিশ কর্মীদের ব্যারাক হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।ভারতীয় ইতিহাস সংকলন সমিতির উত্তর দিনাজপুর জেলার সভাপতি ও বিশিষ্ট প্রত্নতত্ত্ববিদ ড. বৃন্দাবন ঘোষ এক সাক্ষাৎকারে বলেন,
“কালিয়াগঞ্জ থানা শুধু একটি প্রশাসনিক ভবন নয়, এটি উত্তর দিনাজপুরের ইতিহাসের এক মূল্যবান সম্পদ। থানার আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বহু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উদ্ধার হয়েছে। একসময় থানা চত্বরে কালো পাথরের কারুকার্যখচিত বিষ্ণু, মহিষাসুরমর্দিনী, সরস্বতী ও নরসিংহের প্রাচীন মূর্তিও সংরক্ষিত ছিল। এসব তথ্য প্রমাণ করে কালিয়াগঞ্জ থানার ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। তাই অবিলম্বে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের উচিত কালিয়াগঞ্জ থানাকে ‘হেরিটেজ থানা’ হিসেবে ঘোষণা করা।”
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৭৮৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দিনাজপুরকে পৃথক জেলা হিসেবে গঠন করে। পরবর্তীতে ১৭৯২ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিশের পুলিশ প্রশাসন সংস্কার এবং ১৭৯৩ সালের রেগুলেশন–২৪ অনুযায়ী দিনাজপুর জেলায় ২২টি থানার প্রতিষ্ঠা হয়। সেই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ থানাগুলির মধ্যে কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ ও হেমতাবাদ অন্যতম ছিল।এ প্রসঙ্গে কালিয়াগঞ্জ থানার আইসি অভিজিৎ দত্ত বলেন,
“ব্রিটিশ আমলের কালিয়াগঞ্জ থানার ভবনটি এখনও সুন্দরভাবে সংরক্ষিত রয়েছে এবং বর্তমানে পুলিশ কর্মীদের ব্যারাক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেই সময় থানার ওসিদের যাতায়াতের জন্য ঘোড়া দেওয়া হতো এবং প্রতিটি থানায় ঘোড়ার আস্তাবলও থাকত। কালিয়াগঞ্জ থানার সেই ঐতিহাসিক আস্তাবলের অংশ এখনও ভগ্নপ্রায় অবস্থায় টিকে রয়েছে, যা এই থানার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।”তিনি আরও বলেন,
“ভারতীয় ইতিহাস সংকলন সমিতি যে কালিয়াগঞ্জ থানাকে হেরিটেজ থানা হিসেবে ঘোষণার দাবি তুলেছে, তার যথেষ্ট ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। বর্তমান আইসি হিসেবে আমি গর্বিত হব, যদি পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন এই থানাকে ‘হেরিটেজ থানা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এতে শুধু একটি ভবনের সংরক্ষণ হবে না, উত্তর দিনাজপুরের ইতিহাসও আগামী প্রজন্মের কাছে আরও সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরা সম্ভব হবে।”ইতিহাসপ্রেমী ও সংস্কৃতিমনস্ক মহলের একাংশের মতে, কালিয়াগঞ্জ থানাকে হেরিটেজের মর্যাদা দেওয়া হলে জেলার ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটনের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। এখন নজর পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের সিদ্ধান্তের দিকে।

