সরকারের কাছে বদলের প্রত্যাশা: পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাঠামোগত সংস্কারের এখনই সময়
বিনোদ কুমার রুংটা, কালিয়াগঞ্জ:পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং প্রশাসনিক সংস্কারের প্রত্যাশাকেও নতুন করে উসকে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পুলিশ প্রশাসন গড়ে তোলার দাবি জোরালো হয়েছে।গত প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনকে নানা বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, থানার কাজকর্ম, বদলি-পোস্টিং এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে পুলিশের পেশাদারিত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কয়লা, বালু, গরু পাচার, অবৈধ নির্মাণ ও সিন্ডিকেট সংক্রান্ত নানা অভিযোগের ঘটনায়ও পুলিশকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে।নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই দুর্নীতি ও ঘুষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বার্তা দিয়েছে। তবে বাস্তবিক পরিবর্তন আনতে হলে শুধুমাত্র ঘোষণা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক সংস্কার।
থানার জ্বালানি বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি
মাঠ পর্যায়ে কর্মরত পুলিশকর্মীদের মতে, অধিকাংশ থানায় প্রতি মাসে মাত্র ২৪০ লিটার জ্বালানি বরাদ্দ করা হয়, যা বিশাল এলাকা ও ২৪ ঘণ্টার টহল ব্যবস্থার জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর পুলিশি নজরদারি ব্যাহত হয়। প্রশাসনিক মহলের একাংশের মত, এই বরাদ্দ বাড়িয়ে অন্তত ৬০০ লিটার করা হলে থানাগুলির কাজ অনেক বেশি গতিশীল হবে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত নির্ভরশীলতার সুযোগ কমবে।
ড্রাইভার ও গোয়েন্দা তহবিলের প্রয়োজনীয়তা
প্রতি থানায় একটি গাড়ির জন্য মাত্র একজন চালক থাকায় ২৪ ঘণ্টা পরিষেবা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অন্তত দু’জন চালক নিয়োগের দাবি উঠছে।
একইসঙ্গে অপরাধ তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট সরকারি ‘সোর্স মানি’ বা গোপন তহবিল বরাদ্দেরও প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন অভিজ্ঞ পুলিশকর্মীরা। এতে তথ্যদাতা নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হবে বলে তাঁদের মত।
স্বচ্ছ অর্থায়নের দাবি
রাজ্যের বহু থানায় অবস্থিত মা কালীর মন্দির পুলিশ ও সাধারণ মানুষের আস্থার কেন্দ্র। তবে এই মন্দিরগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও পূজার ব্যয়ের জন্য অতীতে বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সরকারি বা বৈধ তহবিলের মাধ্যমে এই ব্যয় পরিচালনার দাবি জানানো হয়েছে।
সিভিল ভলান্টিয়ারদের ভবিষ্যৎ
পুলিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করলেও সিভিল ভলান্টিয়াররা এখনও চুক্তিভিত্তিক কর্মী। মাসিক সীমিত ভাতা এবং চাকরির অনিশ্চয়তা তাঁদের মনোবলে প্রভাব ফেলে। তাঁদের স্থায়ীকরণ ও সম্মানজনক বেতন কাঠামো চালু হলে পুলিশ ব্যবস্থার কার্যকারিতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
স্বচ্ছ বদলি ও পদোন্নতি ব্যবস্থার দাবি
পুলিশ মহলের দীর্ঘদিনের অন্যতম অভিযোগ বদলি ও পোস্টিংকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রভাব ও অস্বচ্ছতা। নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা, বদলি, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও স্বচ্ছ নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং কোনও ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না।আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে একটি স্বাধীন, দক্ষ ও নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনীর ওপর। নতুন সরকারের দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়িত করতে হলে পুলিশের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ, স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই লক্ষ্য পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে পশ্চিমবঙ্গে আরও শক্তিশালী ও জনমুখী পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
