শৌচাগারের জমি দখল করে মার্কেট কমপ্লেক্স! ? প্রশাসনিক তদন্তে ফাঁস একের পর এক গুরুতর অনিয়ম, তীব্র চাঞ্চল্য কালিয়াগঞ্জ জুড়ে
তন্ময় চক্রবর্তী কালিয়াগঞ্জ: সরকারি সম্পত্তি কি বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে? জনসাধারণের জন্য নির্মিত শৌচাগারের জমি কি দখল করে গড়ে তোলা হচ্ছে বহুতল মার্কেট কমপ্লেক্স? উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের মহেন্দ্রগঞ্জ বাজারে এমনই এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক।

প্রশাসনিক তদন্তে উঠে এসেছে একাধিক গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ, যা নিয়ে এখন সরগরম রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষ।মহেন্দ্রগঞ্জ বাজারে ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’ প্রকল্পের অধীনে নির্মিত একটি সরকারি শৌচাগারের অংশবিশেষ ভেঙে সেখানে বহুতল মার্কেট কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হয় বলে অভিযোগ ওঠে।


বিষয়টি নিয়ে কালিয়াগঞ্জের এক সচেতন সমাজকর্মী প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের নির্দেশ দেয় প্রশাসন।তদন্তকারী আধিকারিকের জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি শৌচাগারের একটি অংশ বাস্তবেই আংশিকভাবে ভেঙে ফেলা হয়েছিল এবং সেই জায়গায় বাজার কমপ্লেক্স নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করা হয়।
তদন্তে উঠে আসা তথ্য প্রশাসনিক মহলে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।প্রশাসনিক রিপোর্ট অনুযায়ী—শৌচাগারের অংশবিশেষ ভাঙার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনও বৈধ অনুমোদন বা প্রশাসনিক ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি।সরকারি জমি বা সরকারি পরিকাঠামোর ব্যবহার পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদনের কোনও নথি তদন্ত চলাকালীন পেশ করা যায়নি।নির্মাণকাজ শুরুর ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, কারিগরি মূল্যায়ন ও প্রযুক্তিগত অনুমোদন অনুসরণ করা হয়নি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।শৌচাগারের পরিসর কমে যাওয়ায় বাজারে আগত সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মহিলা, প্রবীণ এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারা সমস্যার মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, জনসাধারণের ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার কোনওভাবেই বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহার করা যায় না।
সরকারি অর্থে নির্মিত পরিকাঠামো ভেঙে সেখানে মার্কেট কমপ্লেক্স তৈরির উদ্যোগ শুধু প্রশাসনিক নিয়মের পরিপন্থী নয়, এটি জনস্বার্থবিরোধী বলেও মত প্রকাশ করেছেন অনেকেই।মহেন্দ্রগঞ্জ বাজার উত্তর দিনাজপুর জেলার অন্যতম ব্যস্ত বাজারগুলির মধ্যে একটি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বাজারে আসেন। এমন পরিস্থিতিতে শৌচাগারের সংখ্যা বা পরিসর কমে গেলে স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা এবং জনস্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।তদন্ত প্রতিবেদনে অনুমোদনহীন ভাঙচুর ও নির্মাণকাজের বিষয়টি উঠে আসার পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কীভাবে সরকারি শৌচাগারের অংশ ভেঙে নির্মাণকাজ শুরু হল? সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি আগে থেকে বিষয়টি জানত কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি সম্পত্তি ও জনসাধারণের সুবিধার বিষয়টি মাথায় রেখে অবিলম্বে ওই নির্মাণকাজ বন্ধ করা হোক এবং যাঁরা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।মহেন্দ্রগঞ্জ বাজারের বহু ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের বক্তব্য, বাজারের উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই উন্নয়নের নামে জনসাধারণের মৌলিক সুবিধা কেড়ে নেওয়া কখনওই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারি শৌচাগারের জমি ও পরিকাঠামো রক্ষা করে বিকল্প জায়গায় উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
ইতিমধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের হাতে জমা পড়েছে। রিপোর্টে উল্লিখিত অভিযোগগুলির ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে কী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, নির্মাণকাজের ভবিষ্যৎ কী হবে এবং সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণে প্রশাসন কতটা কঠোর ভূমিকা নেয়—সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে কালিয়াগঞ্জ তথা মহেন্দ্রগঞ্জ বাজারের হাজার হাজার মানুষ।”সরকারি শৌচাগারের জমি কি বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যবহৃত হবে, নাকি জনস্বার্থ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেবে প্রশাসন?”—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে মহেন্দ্রগঞ্জ বাজার জুড়ে।

