শিক্ষার নতুন দিগন্ত! জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর আলোকে রায়গঞ্জ গার্লস প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যতিক্রমী সামার ক্যাম্পে ইতিহাস, ভাষা ও আনন্দে মাতল খুদে পড়ুয়ারা
তন্ময় চক্রবর্তী, রায়গঞ্জ :জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-এর মূল লক্ষ্য হল বইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণে উৎসাহিত করা। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এক অভিনব ও শিক্ষামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করল রায়গঞ্জ গার্লস প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের উদ্যোগে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও অভিভাবকদের নিয়ে উত্তর দিনাজপুর জেলা সংগ্রহশালা তথা রায়গঞ্জ জেলা মিউজিয়ামে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির পড়ুয়াদের অংশগ্রহণে আয়োজন করা হয় বিশেষ সামার ক্যাম্পের।

প্রতিবছরের মতো এবছরও গরমের দীর্ঘ ছুটিতে বিদ্যালয়ের তরফে পড়ুয়াদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষামূলক সামার প্রজেক্ট দেওয়া হয়েছিল। প্রায় সম্পূর্ণ মে মাস জুড়ে গ্রীষ্মকালীন ছুটির পর সেই প্রজেক্টকে সামনে রেখেই ছাত্র-ছাত্রীরা উৎসাহভরে উপস্থিত হয় কর্ণজোড়া মিউজিয়ামে। বিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ শুধু শিক্ষাকে আনন্দময় করাই নয়, শিশুদের মধ্যে কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।এবারের সামার ক্যাম্পের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘ভারতীয় ভাষা উৎসব’। শিক্ষা দপ্তরের নির্দেশিকা অনুযায়ী বিভিন্ন ভাষাভিত্তিক সৃজনশীল কার্যক্রমে অংশ নেয় খুদে পড়ুয়ারা।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের ২২টি গুরুত্বপূর্ণ ভাষার মধ্যে কিছু ভাষার বর্ণ ব্যবহার করে তারা নিজেদের নামের প্রথম অক্ষর রঙিন ক্লে-এর সাহায্যে তৈরি করে। পাশাপাশি ভারতের মানচিত্রে বিভিন্ন ভাষার বিস্তার চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টাও করে তারা।শুধু তাই নয়, আনন্দের মধ্য দিয়ে শিক্ষাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে আয়োজন করা হয় কুইজ প্রতিযোগিতারও। বিভিন্ন ভাষায় ফল, সবজি, খাবার, লোকনৃত্য, গান, ঐতিহাসিক স্থান এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের নাম সম্পর্কে জানতে পারে ছাত্র-ছাত্রীরা। এর ফলে ছোটবেলা থেকেই ভারতের বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে তাদের জ্ঞান বৃদ্ধি পায় এবং দেশের বৈচিত্র্যকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি হয়।উত্তর দিনাজপুর জেলা সংগ্রহশালায় উপস্থিত হয়ে বহু প্রাচীন নিদর্শন প্রত্যক্ষ করে খুদে পড়ুয়ারা। সেখানে তারা দেখে প্রায় ১৫০০ বছরের পুরনো পোড়া মাটির ফলক, পাল ও সেন যুগের পাথরের ভাস্কর্য, প্রাচীন মুদ্রা ও তলোয়ার, পোড়া মাটির কলসি ও হাড়ি, বহু পুরনো পাণ্ডুলিপি এবং পাথরে খোদাই করা দেবদেবীর মূর্তি। ইতিহাসের এই জীবন্ত সাক্ষ্য ছাত্র-ছাত্রীদের মনে অতীত সম্পর্কে নতুন কৌতূহল ও জানার আগ্রহ সৃষ্টি করেছে বলে মত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের।বিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গত বছরও একইভাবে দুর্গাপুর রাজবাড়িতে সামার ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রতিবছর বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হল পাঠ্যপুস্তকের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে শিশুদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, আনন্দ ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে শেখার সুযোগ করে দেওয়া। বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মতে, এই ধরনের শিক্ষামূলক ক্যাম্প ভবিষ্যৎ জীবনে ছাত্র-ছাত্রীদের চিন্তাভাবনা, জ্ঞানচর্চা এবং ব্যক্তিত্ব গঠনে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।শিক্ষা যখন শুধুই বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলেমিশে যায়, তখনই গড়ে ওঠে প্রকৃত শিক্ষা—আর সেই শিক্ষারই উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠল রায়গঞ্জ গার্লস প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই সামার ক্যাম্প।


