রায়গঞ্জ গার্লস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মর্যাদার সঙ্গে পালিত হল আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী

রায়গঞ্জ: উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ গার্লস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সোমবার শ্রদ্ধা, মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালিত হল ভারতের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, শিল্পোদ্যোগী ও সমাজসংস্কারক আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী। বিদ্যালয়ের শিক্ষক–শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী ও ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপন করা হয়।অনুষ্ঠানের সূচনায় আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের প্রতিকৃতিতে মাল্যদান ও পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে তাঁর জীবন, কর্ম, বৈজ্ঞানিক অবদান, দেশপ্রেম, স্বদেশি ভাবনা এবং মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক–শিক্ষিকারা।

 

তাঁরা শিক্ষার্থীদের সামনে আচার্য রায়ের আদর্শ, কর্মনিষ্ঠা ও বিজ্ঞানচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে তাঁর জীবন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।আলোচনায় বক্তারা জানান, ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার খুলনা জেলার রাড়ুলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। ভারতীয় রসায়ন গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘ভারতের রসায়নের জনক‘ বলা হয়। তিনি দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক হিসেবে সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করেন এবং অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে বিজ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেন।১৮৯৬ সালে তিনি ‘মার্কিউরাস নাইট্রাইট‘ (Mercurous Nitrite) যৌগ আবিষ্কার করে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জগতে ভারতের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। পরবর্তীতে ১৯০১ সালে দেশীয় শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস‘, যা ভারতের প্রথম দেশীয় রাসায়নিক ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলির অন্যতম। এছাড়াও প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস নিয়ে তিনি রচনা করেন বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘A History of Hindu Chemistry’।বক্তারা আরও বলেন, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় শুধু একজন বিজ্ঞানী নন, তিনি ছিলেন মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাদামাটা জীবনযাপন, গরিব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের পাশে দাঁড়ানো, বন্যা ও দুর্যোগে ত্রাণকার্যে অংশগ্রহণ এবং স্বদেশি শিল্প ও দেশীয় পণ্যের প্রসারে তাঁর ভূমিকা আজও অনুকরণীয়।অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গৌরাঙ্গ চৌহান বলেন, “আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় শুধুমাত্র একজন বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী নন, তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক, সমাজসংস্কারক এবং প্রকৃত দেশপ্রেমিক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—জ্ঞান, সততা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমই একজন প্রকৃত মানুষ গড়ে তোলার মূল ভিত্তি। বর্তমান প্রজন্ম যদি তাঁর আদর্শকে অনুসরণ করে বিজ্ঞানমনস্ক, সৃজনশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে, তাহলেই তাঁর জন্মজয়ন্তী পালন সার্থক হবে।“তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মহান ব্যক্তিদের জীবন ও কর্ম থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের আত্মনির্ভরশীলতা, দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ এবং সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। নতুন প্রজন্মকে তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ করাই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।“অনুষ্ঠানের শেষে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক, মানবিক ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে দিনটির কর্মসূচি সমাপ্ত হয়।উল্লেখ্য, ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন কলকাতার বিজ্ঞান কলেজে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহান বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও কর্মবীর। তবে তাঁর আদর্শ, গবেষণা, স্বদেশি ভাবনা এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড আজও ভারতবাসীকে সমানভাবে অনুপ্রাণিত করে চলেছে।