রায়গঞ্জে ঘাসফুলের ঝোড়ো হাওয়া: ফিকে পদ্ম-শিবির, সংখ্যালঘু ও রাজবংশী ভোটে সমীকরণ বদলের ইঙ্গিত
তন্ময় চক্রবর্তী উত্তরবঙ্গের রাজনীতির অলিন্দে এখন একটাই আলোচনা— রায়গঞ্জ কি তবে পাকাপাকিভাবে ঘাসফুলের দুর্গে পরিণত হলো? ২০২৪ সালের জুলাই মাসের বিধানসভা উপনির্বাচনের ফলাফল কেবল একজন প্রার্থীর জয় নয়, বরং উত্তর দিনাজপুরের রাজনীতির চিরাচরিত মেরুকরণকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।২০২১ সালে যে কৃষ্ণ কল্যাণী বিজেপির টিকিটে জয়ী হয়েছিলেন, ২০২৪-এর উপনির্বাচনে তিনিই তৃণমূলের জার্সি গায়ে রেকর্ড গড়ে জিতলেন। ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে: তৃণমূল কংগ্রেস (কৃষ্ণ কল্যাণী): ৮৬,৪৭৯ ভোট (৫৭.৯৭%)বিজেপি (মানস কুমার ঘোষ): ৩৬,৪০২ ভোট (২৪.৪%)কংগ্রেস (মোহিত সেনগুপ্ত): ২৩,১১৬ ভোট (১৫.৫%)তৃণমূল প্রার্থী কৃষ্ণ কল্যাণী প্রায় ৫০,০৭৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে প্রমাণ করেছেন যে, দলবদল করলেও জনমত তাঁর পাশেই রয়েছে। উল্টোদিকে বিজেপির ভোট এক ধাক্কায় প্রায় ২৫% কমে যাওয়া গেরুয়া শিবিরের জন্য অশনি সংকেত।ভোটের অংক: হিন্দু ও সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে?

রায়গঞ্জ কেন্দ্রের রাজনৈতিক সমীকরণ মূলত হিন্দু (প্রায় ৬২%) এবং সংখ্যালঘু (প্রায় ৩৮%) ভোটারদের ওপর নির্ভরশীল। সংখ্যালঘু ভোটের একমুখী মেরুকরণ:উপনির্বাচনে দেখা গেছে, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত বুথগুলোতে তৃণমূল একচেটিয়া ভোট পেয়েছে। কংগ্রেস প্রার্থী মোহিত সেনগুপ্ত অভিজ্ঞ নেতা হওয়া সত্ত্বেও সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ টানতে ব্যর্থ হয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংখ্যালঘুরা তৃণমূলকেই বিজেপির বিরুদ্ধে প্রধান বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন।হিন্দু ও রাজবংশী ভোটে ধস:বিজেপির শক্তির প্রধান জায়গা ছিল রাজবংশী ও বাঙালি হিন্দু ভোট। কিন্তু এবারের ফলাফলে স্পষ্ট, সেই দুর্গে ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে রাজবংশী ভোটারদের একটি বড় অংশ তৃণমূলের লক্ষ্মীর ভাণ্ডারসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পের আকর্ষণে বা বিজেপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তিতিবিরক্ত হয়ে ঘাসফুল শিবিরের দিকে ঝুঁকেছেন।বর্তমানে রায়গঞ্জে বিজেপি কার্যত রক্ষণাত্মক মেজাজে। লোকসভা নির্বাচনে রায়গঞ্জ আসনে বিজেপি জিতলেও বিধানসভা স্তরে তাদের এই পিছিয়ে পড়া দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতাকে প্রকট করে তুলেছে। অন্যদিকে, তৃণমূল এখন সাংগঠনিকভাবে অনেক বেশি সুসংহত।এই উপনির্বাচনের ফলাফলের নিরিখে বলা যায়:তৃণমূলের দাপট: যদি বর্তমান ভোটব্যাংক ধরে রাখা যায়, তবে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে রায়গঞ্জ আসনটি তৃণমূলের জন্য নিরাপদ হতে চলেছে।কংগ্রেসের ১৫% ভোট আগামীতে কোন দিকে যায়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। এই ভোট যদি তৃণমূলের দিকে যায়, তবে বিরোধীদের লড়াই কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।হিন্দু ভোটের যে অংশটি এবার তৃণমূলের দিকে গেছে, তাদের ফেরাতে না পারলে রায়গঞ্জে বিজেপির ফিরে আসা কঠিন।রায়গঞ্জের এই ফলাফল আসলে উত্তরবঙ্গের বদলে যাওয়া রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। গত কয়েক বছরে বিজেপির যে একচ্ছত্র আধিপত্য এই এলাকায় দেখা গিয়েছিল, তা এখন তৃণমূলের কৌশলী রাজনীতির কাছে বড় পরীক্ষার সম্মুখীন।
