রাধিকাপুর স্টেশনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পথে বড় পদক্ষেপ! শেষের পথে জোড়া লুপ লাইনের কাজ, ৬.৯৫ কোটি টাকায় বদলাচ্ছে সীমান্ত স্টেশনের পরিকাঠামো

তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ, ১ সেপ্টেম্বর: ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের প্রান্তিক রেল স্টেশন রাধিকাপুরকে আরও আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলতে জোরকদমে চলছে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ। রাধিকাপুর টার্মিনাল রেল স্টেশনে দুটি নতুন লুপ লাইন তৈরির কাজ ইতিমধ্যেই শেষের পথে। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নতুন ইন্টারলকিং রুম, ডাইভারশন রোড এবং অত্যাধুনিক রেল গুমটি।

 

এই কাজগুলি সম্পূর্ণ হলে রাধিকাপুর স্টেশনে ট্রেন দাঁড় করানো এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে বর্তমানের একাধিক সমস্যা অনেকটাই মিটবে বলে আশা করা হচ্ছে।রাধিকাপুর রেল স্টেশনের পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরেই সরব ছিলেন রায়গঞ্জের সাংসদ কার্তিক চন্দ্র পাল। রাধিকাপুরের মতো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তিক স্টেশনের পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি দিল্লিতে গিয়ে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে রাধিকাপুর স্টেশনে লুপ লাইন-সহ প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির জন্য অর্থ বরাদ্দের আবেদন জানান সাংসদ।সাংসদের আবেদনে রেলমন্ত্রী ইতিবাচক আশ্বাস দেন বলে জানা গেছে। তারই ফলস্বরূপ ২০২৫ সালে রাধিকাপুরের মতো ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের প্রান্তিক স্টেশনের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য রেল দপ্তরের পক্ষ থেকে ৬.৯৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়।রায়গঞ্জের সাংসদ কার্তিক চন্দ্র পাল বলেন, “রেল স্টেশনের যে পরিকাঠামোগুলির কাজ না হলেই নয়, সেগুলি করতেই হবে। রাধিকাপুরে বর্তমানে যে কাজগুলি দ্রুতগতিতে চলছে, সেগুলি সম্পূর্ণ হয়ে গেলে স্টেশনটি মোটামুটি ভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে।”সাংসদের বক্তব্য অনুযায়ী, বরাদ্দকৃত ৬.৯৫ কোটি টাকা দিয়ে দুটি লুপ লাইনের পাশাপাশি নতুন ইন্টারলকিং রুম, ডাইভারশন রোড এবং আধুনিক রেল গুমটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ফলে রাধিকাপুর স্টেশনের নিরাপত্তা, ট্রেন পরিচালনা এবং স্টেশনের সামগ্রিক কার্যক্ষমতা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

জোড়া লুপ লাইনেই বদলে যাবে ট্রেন পরিচালনার চিত্র

বর্তমানে রাধিকাপুর স্টেশনে রয়েছে তিনটি ট্র্যাক। জায়গার স্বল্পতা থাকা সত্ত্বেও এই স্টেশন থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ট্রেন চলাচল করে। রাধিকাপুর–কলকাতা, রাধিকাপুর–হাওড়া, সাপ্তাহিক রাধিকাপুর–বেঙ্গালুরু এবং সাপ্তাহিক রাধিকাপুর–দিল্লি ট্রেনের পাশাপাশি রাধিকাপুর থেকে তিন জোড়া কাটিহার প্যাসেঞ্জার ট্রেন, এনজেপি ইন্টারসিটি এবং তেলতা ডেমো ট্রেনও চলাচল করে।

ফলে স্টেশনে ট্রেন রাখার ক্ষেত্রে অনেক সময় পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। নতুন দুটি লুপ লাইন চালু হয়ে গেলে সেই সমস্যা অনেকটাই কমবে। বিশেষ করে একাধিক ট্রেন একই সময়ে স্টেশনে এলে ট্রেন দাঁড় করানো ও পরিচালনার ক্ষেত্রে রেলের হাতে অতিরিক্ত জায়গা থাকবে।

রেলপ্রেমী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রাধিকাপুরে লুপ লাইনের কাজ সম্পূর্ণ হওয়া শুধু একটি পরিকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, উত্তর দিনাজপুরের রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

নতুন ট্রেন চালুর আশাও বাড়ছে

লুপ লাইনের কাজ সম্পূর্ণ হলে রাধিকাপুর থেকে আরও দূরপাল্লার ট্রেন চালুর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে কামাখ্যা এবং উত্তর ভারতের দিকে নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। যদিও নতুন ট্রেন চালুর বিষয়ে এখনও রেলের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি, তবে রাধিকাপুর স্টেশনের পরিকাঠামো উন্নত হলে ভবিষ্যতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ অনেকটাই তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

রাধিকাপুর যেহেতু ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রান্তিক স্টেশন, তাই এর পরিকাঠামো উন্নয়ন হলে সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকার যাত্রীদেরও সুবিধা হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা এবং কর্মসূত্রে কলকাতা ও দেশের অন্যান্য প্রান্তে যাতায়াতকারী মানুষজনও এর সুফল পেতে পারেন।

লুপ লাইন নিয়ে আশাবাদী রেল উন্নয়ন কমিটি

রাধিকাপুরের এই পরিকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে আশাবাদী কালিয়াগঞ্জ-বুনিয়াদপুর রেল রূপায়ণ ও উন্নয়ন কমিটিও। উত্তর দিনাজপুর জেলার ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তথা ওই কমিটির যুগ্ম সম্পাদক প্রসূন দাস বলেন, রায়গঞ্জের সাংসদ কার্তিক চন্দ্র পালের তৎপরতা ছাড়া রাধিকাপুরের লুপ লাইনের কাজ সম্ভব হত না।

তিনি আরও বলেন, সাংসদ তাঁর পাঁচ বছরের সময়কালের মধ্যে শুধু রাধিকাপুরের লুপ লাইন নয়, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা কালিয়াগঞ্জ–বুনিয়াদপুর রেল প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজও শুরু করতে পেরেছেন।

স্থানীয় রেলপ্রেমীদের মতে, রাধিকাপুর স্টেশনে লুপ লাইনের কাজ শেষ হওয়া উত্তর দিনাজপুরের রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তিক স্টেশন হিসেবে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে থাকা রাধিকাপুর এবার ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ টার্মিনাল স্টেশনের পরিকাঠামোর দিকে এগোচ্ছে।

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে জোড়া লুপ লাইন, নতুন ইন্টারলকিং ব্যবস্থা, ডাইভারশন রোড এবং আধুনিক রেল গুমটির কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর রাধিকাপুর স্টেশনের ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনই ভবিষ্যতে আরও নতুন ট্রেন পাওয়ার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হবে। সীমান্তের এই প্রান্তিক স্টেশনকে ঘিরে তাই নতুন আশায় বুক বাঁধছেন উত্তর দিনাজপুরের রেলযাত্রীরা।