বেনারসির বদলে ‘আনারশি’ শাড়ির স্বপ্ন! আনারসের পাতার সুতোয় উত্তরবঙ্গে গড়ে উঠতে পারে নতুন শিল্প, উদ্যোগ নিলেই মিলবে হাজারো কর্মসংস্থান
তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ, ৩১ জুলাই:উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে উৎপাদিত আনারস শুধু ফল হিসেবেই নয়, তার পাতা থেকেও গড়ে উঠতে পারে এক নতুন শিল্প বিপ্লব। চোপড়া, ইসলামপুর এবং দার্জিলিং জেলার বিধাননগর এলাকায় উৎপাদিত আনারসের পাতা থেকে সুতো তৈরি করে সেই সুতোয় বোনা হতে পারে বাংলার নিজস্ব ‘আনারশি শাড়ি’—যা একদিন বেনারসির বিকল্প হিসেবেও পরিচিতি পেতে পারে।
বহু বছর ধরে এমনই এক সম্ভাবনার কথা শোনা গেলেও বাস্তবে সেই স্বপ্ন আজও অধরাই রয়ে গেছে।উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়া, ইসলামপুর এবং দার্জিলিং জেলার বিধাননগর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই হাজার হাজার একর জমিতে আনারস চাষ হয়ে আসছে। কৃষকদের মতে, আনারসের ফল বিক্রির পাশাপাশি এর পাতাও অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে আনারসের পাতা থেকে উন্নতমানের পরিবেশবান্ধব সুতো তৈরি সম্ভব, যা দিয়ে শাড়ি, পোশাক, ব্যাগসহ নানা হস্তশিল্প সামগ্রী উৎপাদন করা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এত বিপুল কাঁচামাল থাকা সত্ত্বেও অতীতে কোনো সরকারই আনারসকেন্দ্রিক কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। এক সময় দার্জিলিং জেলার বিধাননগরে বেসরকারি উদ্যোগে আনারসের পাতা থেকে সুতো তৈরির কাজ শুরু হলেও সরকারি সহায়তার অভাবে সেই উদ্যোগ বেশিদিন টেকেনি। ফলে সম্ভাবনাময় একটি শিল্প ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।বিধাননগরের বহু মহিলা তখন এই শিল্পকে ঘিরে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন। তাঁদের আশা ছিল, স্থানীয়ভাবে সুতো তৈরি হবে, সেই সুতো দিয়ে উত্তরবঙ্গেই তৈরি হবে নতুন ধরনের শাড়ি—‘আনারশি শাড়ি’। এতে যেমন মহিলাদের কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি উত্তরবঙ্গের একটি নিজস্ব ব্র্যান্ডও তৈরি হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবের মুখ দেখেনি।চোপড়ার আনারস চাষি সফিকুল আলম এবং বিধাননগরের চাষি অসীম সিংহ জানান, বর্তমানে আগের তুলনায় আনারস চাষ কিছুটা কমলেও এখনও কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়। তাঁদের মতে, বর্তমান রাজ্য সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিলে আনারসের পাতা থেকে সুতো উৎপাদন এবং সেই সুতো দিয়ে শাড়ি তৈরির শিল্প গড়ে তোলা এখনো সম্পূর্ণ সম্ভব।তাঁরা বলেন, এতে শুধু কৃষকের আয়ই বাড়বে না, হাজার হাজার গ্রামীণ মহিলা ঘরে বসেই কাজের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গে গড়ে উঠবে একটি পরিবেশবান্ধব, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি পেতে পারে।উত্তর দিনাজপুর জেলা শিল্প কেন্দ্রের প্রাক্তন চিফ জেনারেল ম্যানেজার সুনীল সরকার বলেন, ইসলামপুর মহকুমা ও বিধাননগর এলাকায় এখনও যে পরিমাণ আনারস উৎপাদিত হয়, তা এই শিল্প গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। তাঁর মতে, সরকার যদি এই প্রকল্পে এগিয়ে আসে, তাহলে শিল্পের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার খবরেই বহু কৃষক আবার নতুন করে আনারস চাষে আগ্রহী হবেন।তিনি আরও বলেন, শিল্প স্থাপনের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। সরকারের সেই মানসিকতা থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই এই শিল্প হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা বৃদ্ধিতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।স্থানীয়দের দাবি, রাজ্যের ক্ষুদ্র, কুটির ও কৃষিভিত্তিক শিল্প দপ্তর যদি আনারসের পাতা থেকে সুতো তৈরির প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করে, তাহলে উত্তরবঙ্গে এক নতুন শিল্পের সূচনা হতে পারে। এতে কৃষি ও শিল্পের সমন্বয়ে গড়ে উঠবে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত।উত্তরবঙ্গের মানুষের দীর্ঘদিনের আশা, একদিন বাংলার তাঁতে বোনা হবে আনারসের পাতার সুতো, আর সেই সুতোয় তৈরি ‘আনারশি শাড়ি’ বিশ্ববাজারে উত্তরবঙ্গের নতুন পরিচয় হয়ে উঠবে। সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে খুব বেশি সময় লাগবে না বলেই আশাবাদী কৃষক, শিল্প বিশেষজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষ।

