‘চিচিং ফাঁক’ কলকাতায়, কম্পন কালিয়াগঞ্জে! ‘ঘাসফুল’ থেকে ‘পদ্ম’— দলবদলের জল্পনায় কাঁপছে পৌর রাজনীতি, তৃণমূল কাউন্সিলরদের ঘিরে চাঞ্চল্য
তন্ময় চক্রবর্তী রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু হয় না— এই আপ্তবাক্যটিই যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হতে চলেছে উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ পৌরসভায়। কলকাতায় বিজেপি রাজ্য দপ্তরে ‘চিচিং ফাঁক’ হতেই তার তুমুল কম্পন অনুভূত হচ্ছে কালিয়াগঞ্জের তৃণমূল শিবিরে। তবে এই কম্পন ভয়ের নয়, বরং এক অদ্ভুত স্বস্তির ও সুযোগের! দলবদলের জল্পনায় এখন রীতিমতো সরগরম কালিয়াগঞ্জের রাজনৈতিক বাতাস।

পৌরসভার অন্দরে কান পাতলেই এখন শোনা যাচ্ছে একটাই গুঞ্জন— “কে কার আগে দাদার আশীর্বাদ নিয়ে পদ্ম শিবিরে নাম লেখাতে পারেন!”খাতায়-কলমে কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার ১৭টি ওয়ার্ডের রাশ শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের হাতেই রয়েছে। সমীকরণটি আপাতত এই রকম:তৃণমূল কংগ্রেস: ১০ জন কাউন্সিলর বিজেপি: ৬ জন কাউন্সিলরনির্দল: ১ জন কাউন্সিলরস্থানীয় সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকজন তৃণমূল কাউন্সিলরকে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে বিজেপি কাউন্সিলরদের সঙ্গে একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে দেখা গেছে। এই ঘটনাকেই ঘিরে শুরু হয়েছে নানা জল্পনা।স্থানীয় এক প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কথায়,“রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই।

পরিস্থিতি বদলালে রাজনৈতিক অবস্থানও বদলায়। কালিয়াগঞ্জেও সেই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে বলেই অনেকের ধারণা।“কালিয়াগঞ্জের চায়ের দোকান থেকে বাজার— সর্বত্র এখন এই নিয়েই আলোচনা। সাধারণ মানুষের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া শোনা যাচ্ছে।এক বাসিন্দার কথায়,“ভোটের আগে এক কথা, ভোটের পরে আর এক কথা— এটা মানুষ আর মেনে নিতে পারছে না। যদি আদর্শই বদলে যায়, তাহলে ভোটাররা কাকে বিশ্বাস করবে?
“আরও এক স্থানীয় বাসিন্দার বক্তব্য,“যাঁরা এতদিন বিজেপির বিরুদ্ধে সরব ছিলেন, এখন তাঁদেরই বিজেপি নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে দেখা যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।“আরেকজনের মন্তব্য,“রাজনীতিতে পালাবদল নতুন নয়। কিন্তু মানুষের ভোট নিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পর যদি অবস্থান বদলে যায়, তাহলে তার জবাব ভোটারদের কাছেই দিতে হবে।“এক সময় বিজেপির নাম শুনলেই আপত্তি, এখন কেন্দ্রীয় প্রকল্পের মঞ্চে বিজেপি কাউন্সিলরদের পাশে! সাধারণ মানুষের প্রশ্ন— “এটাই কি তবে রাজনীতির নতুন রূপ?”রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, কালিয়াগঞ্জে ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। যদিও এই বিষয়ে কোনও তৃণমূল কাউন্সিলর প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাননি। বিজেপির তরফ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৃণমূলের দিকে থাকলেও, কলকাতার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক হাওয়া বদলের পর কালিয়াগঞ্জের ঘাসফুল শিবিরের কাউন্সিলরদের মধ্যে হঠাৎ করেই ‘রাম-ভক্তি’ জেগে উঠেছে। ভেতরের খবর, ১০ জন তৃণমূল কাউন্সিলরের মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ৯ জনই এখন মনে-প্রাণে পদ্ম শিবিরের দিকে ঝুঁকে রয়েছেন।লক্ষ্য এখন বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিন’!স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের দাবি, কালিয়াগঞ্জের তৃণমূল কাউন্সিলরদের একাংশ এখন নিজেদের দল বাঁচানোর চেয়ে বিজেপির কাউন্সিলরদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেই বেশি ব্যস্ত। দিন-রাত তাঁদের মধ্যে চলছে ‘মাখামাখি’ সম্পর্ক। কিন্তু কেন এই হঠাৎ ভোলবদল?এলাকার এক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কথায়: “সবাই দেখছে কলকাতায় কীভাবে বিজেপির দরজা খুলে যাচ্ছে। কালিয়াগঞ্জের কাউন্সিলররা শুধু মোক্ষম সুযোগের অপেক্ষায় আছেন। কলকাতায় যেভাবে ‘চিচিং ফাঁক’ হয়েছে, কালিয়াগঞ্জেও যদি বিজেপি একবার দরজাটা পুরোপুরি খুলে দেয়, তবে আর এক মুহূর্তও দেরি করবেন না এঁরা। সোজা বিজেপির ‘ওয়াশিং মেশিনে’ ঢুকে নিজেদের ধুয়ে মুছে সাফ করে পদ্ম শিবিরে নাম লেখাবেন।”শুধু সময়ের অপেক্ষা!আপাতত কালিয়াগঞ্জ পৌরসভায় শান্ত পরিবেশ থাকলেও, ভেতরে ভেতরে যে দলবদলের এক বিশাল সুনামি তৈরি হচ্ছে, তা স্পষ্ট। তৃণমূলের এই ৮-৯ জন ‘রাম-ভক্ত’ কাউন্সিলর এখন শুধু কলকাতার গ্রিন সিগন্যাল এবং ‘দাদার’ অভয়বাণীর অপেক্ষায় দিন গুনছেন।এবং তৃণমূল পরিচালিত পৌরসভা কে তৃণমূল কংগ্রেসের কাউন্সিলরাই ভেঙে দেন আচমকা পদত্যাগ করে। ফলে তড়িঘড়ি রাজ্য নগর উন্নয়ন দপ্তরের নির্দেশে কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার নতুন চেয়ারম্যান করা হয় বিগত দিনে কালিয়াগঞ্জের উন্নয়নের কান্ডারী রায়গঞ্জের সাংসদ কার্তিক চন্দ্র পাল কে। এখন এই কাউন্সিলর তৈরি দেখা যাচ্ছে বিজেপির পরিচালিত কেন্দ্র সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে বিজেপি কাউন্সিলরদের পাশাপাশি তাদেরও একসাথে দাঁড়াতে। তৃণমূল পরিচালিত কালিয়াগঞ্জের পৌর বোর্ড যখন ছিল যেসব কাউন্সিলররা বিজেপির নাম শুনতে পারতেন না আজ তাদের দেখলে মনে হয় তারা দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি করতেন। এটাই হলো পালা বদল। আর এটাই রাজনীতিতে সম্ভব।
