কালিয়াগঞ্জে ভোটযুদ্ধ তুঙ্গে: মহারাজ বনাম নিতাই, সমীকরণে উত্তেজনার পারদ চড়ছে
তন্ময় চক্রবর্তী :- তেইশে মে উত্তর দিনাজপুর জেলার নয়টি বিধানসভা আসনে ভোটগ্রহণ। কিন্তু উত্তরের এই হিমেল জনপদে এখন রাজনীতির পারদ চড়চড় করে বাড়ছে একটি কেন্দ্রকে ঘিরে— কালিয়াগঞ্জ। রাজবংশী অধ্যুষিত এই জনপদে গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিধায়কের দলবদল এবং প্রার্থী নির্বাচনে চমক, সব মিলিয়ে কালিয়াগঞ্জ এখন বঙ্গ রাজনীতির ‘হটস্পট’।গত বিধানসভা নির্বাচনে এই কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে জয়ী হয়েছিলেন সৌমেন রায়।

কিন্তু জয়ের পর তাঁর তৃণমূলে গমন এবং পুনরায় বিজেপিতে প্রত্যাবর্তনকে ভালো চোখে দেখেনি গেরুয়া শিবিরের শীর্ষ নেতৃত্ব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়াতেই এবার সৌমেন রায়কে টিকিট দেয়নি বিজেপি। দলবদলের এই সংস্কৃতি যে ভোটাররা পছন্দ করছেন না, তা হাড়িকাঠে টের পেয়েছেন প্রাক্তন বিধায়ক।সৌমেন রায়কে সরিয়ে বিজেপি এবার মাঠে নামিয়েছে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের উৎপল মহারাজকে। বিজেপির অন্দরমহলে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, “কালিয়াগঞ্জে কলাগাছ দাঁড়ালেও জিতবে, সেখানে তো স্বয়ং মহারাজ!” গেরুয়া শিবিরের আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে গত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল, যেখানে কালিয়াগঞ্জ থেকে বিজেপি প্রার্থী বিপুল লিড পেয়েছিলেন।একান্ত সাক্ষাৎকারে উৎপল মহারাজ বলেন:”বিজেপি আমায় প্রার্থী করে যে সম্মান দিয়েছে তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। এই রাজ্যে সততার বুলি নিয়ে আসা সরকার আজ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। কালিয়াগঞ্জের যোগাযোগ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোই হবে আমার প্রথম লক্ষ্য।”অন্যদিকে, বিজেপিকে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়তে নারাজ তৃণমূল কংগ্রেস। ঘাসফুল শিবির এবার ভরসা রেখেছে অভিজ্ঞ এবং পরিচিত মুখ জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ নিতাই বৈশ্যের ওপর। নিতাইবাবুর দাবি, বিজেপি কেবল ধর্মের সুড়সুড়ি দিয়ে ভোট নিতে চায়। তিনি সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন বিজেপি প্রার্থীর ব্যক্তিগত জীবন ও সিদ্ধান্ত নিয়ে।তৃণমূল প্রার্থী নিতাই বৈশ্যের হুঙ্কার,”মানুষ বুঝে গেছে মহারাজ আর ত্যাগী নন, তিনি এখন ভোগী। কিসের লোভে সন্ন্যাস ধর্ম ছেড়ে রাজনীতিতে এলেন তা সাধারণ মানুষ ভোটবাক্সেই বুঝিয়ে দেবেন। রাজ্যের উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে কালিয়াগঞ্জে তৃণমূলের বিধায়ক থাকা আবশ্যিক।”এই দুই হেভিওয়েট লড়াইয়ের মাঝে নিজেদের জমি ফিরে পেতে মরিয়া বামফ্রন্ট। সিপিএমের তরফে প্রার্থী করা হয়েছে পঞ্চায়েত সমিতির প্রাক্তন সভাপতি হিরু বালা রায়কে। গ্রামগঞ্জের মানুষের কাছে পরিচিত মুখ হিরু বালার ওপর ভর করে লাল ঝাণ্ডার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চলছে জোরকদমে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কংগ্রেসের তরফে প্রার্থীর নাম ঘোষণা না হওয়ায় জোটের সমীকরণ নিয়ে ধন্দ রয়েই গেছে।ভোটের দিন ঘোষণার পর থেকেই কালিয়াগঞ্জের গ্রামেগঞ্জে, হাটে-বাজারে প্রার্থীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। প্রার্থীরা কখনও দলীয় কর্মীদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন, কখনও আবার চায়ের দোকানে বসে আমজনতার নাড়ি বোঝার চেষ্টা করছেন। বিজেপি যেখানে হিন্দু ভোট ব্যাংক এবং লোকসভার ‘লিড’ ধরে রাখতে মরিয়া, তৃণমূল সেখানে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও সরকারি উন্নয়নের খতিয়ান নিয়ে মানুষের দুয়ারে কড়া নাড়ছে।বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদী সেন্টিমেন্ট বনাম তৃণমূলের উন্নয়ন কার্ড— এই লড়াইয়ে কে জিতবে? গত নির্বাচনে বিজেপির পালে হাওয়া থাকলেও এবার টিকিট বন্টন এবং প্রার্থীর ভাবমূর্তি ফ্যাক্টর হতে পারে। কালিয়াগঞ্জের রাজবংশী ভোট কি মহারাজকে আশীর্বাদ করবে, নাকি নিতাই বৈশ্যের ওপর ভরসা রেখে উন্নয়নের চাকা সচল রাখবে? উত্তর মিলবে তেইশে মে-র রায়ে।

