রেলের হুইসেলের সঙ্গেই মিশে আছে মায়ের আগমনী! দেশভাগের আগের ঐতিহ্য বুকে নিয়ে আজও জ্বলজ্বল করছে কালিয়াগঞ্জ রেলস্টেশনের দুর্গাপুজো

তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ:  রেলের হুইসেল, ট্রেনের ছুটে চলা আর শরতের আকাশে কাশফুল—এই তিনের সঙ্গে যেন বহু বছর ধরেই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে কালিয়াগঞ্জ রেলস্টেশনের দুর্গাপুজো। চাকচিক্য কিংবা আধুনিক থিমের বাহার হয়তো নেই, কিন্তু রয়েছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, নিষ্ঠা, ভক্তি আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক গভীর আবেগ।

দেশভাগের আগের সময় থেকে চলে আসা এই পুজো আজও কালিয়াগঞ্জবাসীর কাছে অন্যতম আকর্ষণ।স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে জানা যায়, কালিয়াগঞ্জে রেল যোগাযোগ শুরু হওয়ার সময় থেকেই রেলকেন্দ্রিক এই দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল। সেই সময় পুজোর প্রতিমা পর্যন্ত আসত অবিভক্ত ভারতের দিনাজপুর অঞ্চল থেকে, যা বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্গত। দেশভাগের পর মানচিত্র বদলে গিয়েছে, বদলে গিয়েছে দুই বাংলার রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিচয়। কিন্তু বদলায়নি মায়ের আরাধনার সেই ধারাবাহিকতা।কালিয়াগঞ্জ রেলস্টেশন আজ বারসই–রাধিকাপুর শাখা লাইনের গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। রেলপথকে কেন্দ্র করে একসময় এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল রেলকর্মী, তাঁদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষের এক বিশেষ সামাজিক পরিবেশ। সেই পরিবেশের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল দুর্গাপুজো।এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশভাগের আগের কালিয়াগঞ্জের স্মৃতি। একসময় রেলকর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরাই পুজোর মূল আয়োজন করতেন। পরে ধীরে ধীরে আশপাশের সাধারণ মানুষও এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।পুজোর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। রেলকর্মীরা নিজেদের কাজের পাশাপাশি পুজোর আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। মণ্ডপ তৈরি, প্রতিমা আনা, পুজোর সামগ্রী সংগ্রহ থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি—সবকিছুতেই থাকে সম্মিলিত উদ্যোগ।পুজোর চার দিন কালিয়াগঞ্জ রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা যেন অন্য রূপ ধারণ করে। একদিকে রেললাইনে ট্রেনের আসা-যাওয়া, অন্যদিকে মণ্ডপে ঢাকের বাদ্যি—দুটি শব্দ মিলে তৈরি করে এক অনন্য পরিবেশ।সন্ধ্যা নামলেই মণ্ডপে জ্বলে ওঠে আলো। পুজোর পাশাপাশি ছোটখাটো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়। আর পুজোর চার দিন ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয় খিচুড়ি প্রসাদ।কালিয়াগঞ্জ শহরের অন্যান্য বড় পুজোর মতো এই পুজোয় হয়তো বাহারি আলোকসজ্জা কিংবা বিশাল থিমের মণ্ডপ দেখা যায় না। কিন্তু এই পুজোর আকর্ষণ অন্য জায়গায়। এখানে রয়েছে প্রাচীনত্বের ছোঁয়া, রয়েছে নিষ্ঠা, ভক্তি এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য।কালিয়াগঞ্জের মানুষ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে পুজো দেখতে গেলেও রেলস্টেশনের এই পুজোয় একবার না এলে যেন তাঁদের পুজো সম্পূর্ণ হয় না। বহু পরিবার বছরের পর বছর ধরে এই পুজোর সঙ্গে নিজেদের স্মৃতি জড়িয়ে রেখেছে।কারও কাছে এটি ছোটবেলার পুজোর স্মৃতি, কারও কাছে রেলকর্মী জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দিনগুলির স্মারক, আবার কারও কাছে দেশভাগের আগে ও পরের ইতিহাসকে ছুঁয়ে থাকা এক জীবন্ত ঐতিহ্য।এই পুজোর সবচেয়ে আবেগঘন দিকগুলির একটি হল—একসময় যে প্রতিমা অবিভক্ত দিনাজপুর অঞ্চল থেকে আসত, দেশভাগের পর সেই ভূখণ্ড দুই দেশের মধ্যে বিভক্ত হয়ে গেলেও মায়ের আরাধনার ধারাটি থেমে যায়নি।সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলেছে। রেলপথের চেহারা বদলেছে, স্টেশন আধুনিক হয়েছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। কিন্তু মায়ের সামনে ভক্তির প্রদীপ আজও একইভাবে জ্বলে।শরৎ আসতেই ফের শুরু হয়েছে কালিয়াগঞ্জ রেলস্টেশনের দুর্গাপুজোর প্রস্তুতি। রেলকর্মীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন পুজোর আয়োজন নিয়ে। মণ্ডপ, প্রতিমা, পুজোর সামগ্রী এবং চার দিনের অনুষ্ঠান—সবকিছু ঘিরেই চলছে প্রস্তুতি।বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই পুজো তাই শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি কালিয়াগঞ্জের রেল ইতিহাসের অংশ, দেশভাগের স্মৃতির অংশ এবং বহু মানুষের আবেগের অংশ।রেললাইনে আজও ছুটে চলে ট্রেন। স্টেশনে আজও শোনা যায় হুইসেল। আর শরৎ এলেই সেই হুইসেলের সঙ্গে যেন মিশে যায় ঢাকের শব্দ—জানিয়ে দেয়, আবারও আসছেন মা।কালিয়াগঞ্জ রেলস্টেশনের দুর্গাপুজো তাই শুধু পুজো নয়—এ এক শতবর্ষ ছুঁয়ে থাকা স্মৃতি, ঐতিহ্য ও দুই বাংলার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।কালিয়াগঞ্জ রেলস্টেশনের কর্মী প্রমোদ কুমার বলেন, “কালিয়াগঞ্জ রেলস্টেশন চালু হওয়ার সময় থেকেই এখানে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল বলে আমরা শুনে আসছি। সেই সময় ভারত ও বাংলাদেশ আলাদা দেশ ছিল না। তখন এই পুজোর প্রতিমা তৎকালীন বাংলাদেশের দিনাজপুর থেকে নিয়ে আসা হতো। দেশভাগের পর পরিস্থিতি বদলে যায়, বদলে যায় প্রতিমা আনার ব্যবস্থাও। বর্তমানে আর ওপার বাংলা থেকে প্রতিমা আনা হয় না, এখানেই প্রতিমা তৈরি করা হয়। তবে দেশভাগ, সময়ের পরিবর্তন কিংবা নানা পরিবর্তনের মধ্যেও মায়ের আরাধনার সেই ঐতিহ্য আজও একইভাবে চলে আসছে।”কালিয়াগঞ্জ রেলস্টেশনের সুপারিনটেনডেন্ট পঙ্কজ কুমার বলেন, “দুর্গাপুজো বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব। তাই এই পুজোকে ঘিরে আমাদের মধ্যেও আলাদা উৎসাহ ও আনন্দ থাকে। পুজোর কয়েক দিন রেলস্টেশন চত্বরেও উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়। রেলকর্মী থেকে শুরু করে তাঁদের পরিবারের সদস্য এবং সাধারণ মানুষ—সকলেই আনন্দের সঙ্গে এই উৎসবে সামিল হন। বহু বছরের এই পুজোর ঐতিহ্যকে ধরে রেখে আমরা প্রতিবছর নিষ্ঠা ও আনন্দের সঙ্গে মায়ের আরাধনা করি।” রাজকিশোর প্রসাদ বলেন, “এই পুজোকে কেন্দ্র করে আমরা চারটি দিন অত্যন্ত আনন্দ ও উৎসাহের সঙ্গে কাটাই। পুজোর সময় রেলস্টেশন চত্বরের পরিবেশটাই যেন বদলে যায়। রেলকর্মী, তাঁদের পরিবার এবং আশপাশের মানুষ সবাই একসঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠেন। পুজোর আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি আনন্দ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং প্রসাদ বিতরণ—সব মিলিয়ে চার দিন এখানে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। এই পুজোর সঙ্গে আমাদের আবেগ ও বহু বছরের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।”