রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক কর্মশালার সূচনা: গবেষণার নতুন দিগন্ত উম্মোচনে একজোট বিশেষজ্ঞরা
পিয়া গুপ্তা চক্রবর্তী, রায়গঞ্জ রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে মঙ্গলবার থেকে শুরু হলো সাত দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক কর্মশালা। এই কর্মশালার মূল বিষয়বস্তু হল গবেষণা পদ্ধতি ও পুঁথিবিদ্যাচর্চা ।বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের যৌথ উদ্যোগে এবং IQAC-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানটি ৩০শে জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে।এদিন প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও বেদমন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে সংস্কৃত বিভাগ ও বাংলা বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাগত সঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তা হিসেবে এদিন উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক পবিত্রভূষণ সরকার।এছাড়াও এই দিন উপস্থিত ছিলেন রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য অধ্যাপক দীপক কুমার রায়, বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা অনুষদ অধ্যাপক প্রদীপ কুমার দাস, কলা বাণিজ্য ও আইন বিভাগের অনুষদ অধ্যাপক নুরুজ্জামান কাশেমী, এছাড়া রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসসি নির্দেশক অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার মহলা, এবং সংস্কৃত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক স্বপন মাল, অধ্যাপক সমীর কুমার মন্ডল এছাড়াও একগুচ্ছ অধ্যাপক ও গবেষকেরা।অনুষ্ঠানের প্রথমেই স্বাগত ভাষণ দেন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মিলন কুমার রায়।

এরপরই উদ্বোধনী ভাষন পরিবেশন করেন রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক দীপক কুমার রায়।উদ্বোধনী ভাষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক দীপক কুমার রায় গবেষণার আধুনিক পদ্ধতি এবং উত্তরবঙ্গের প্রাচীন পুঁথিবিদ্যাচর্চার গুরুত্ব নিয়ে এক তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।এদিন আক্ষেপের সুরে তিনি জানান ,উত্তরবঙ্গের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মূল্যবান প্রাচীন পুঁথি, যা আজও লোকচক্ষুর অন্তরালে। বিশেষ করে উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জের তরঙ্গপুর এলাকায় যে বিপুল পরিমাণ পুঁথির ভাণ্ডার পাওয়া গেছে, তা গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।ছাত্র-ছাত্রী ও গবেষকদের উৎসাহিত করে উপাচার্য বলেন, “উত্তরবঙ্গের এই অমূল্য পুঁথিগুলো নিয়ে আগামী দিনে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজন।এরপরই ছাত্র ছাত্রীদের পড়াশোনা ও গবেষণার মান নিয়ে কড়া বার্তা দিলেন আইকিউএসি (IQAC) ডিরেক্টর অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার মহলা। গবেষণার জটিলতা ও সমাধান নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বর্তমান প্রজন্মের গবেষকদের একাংশের দায়সারা মনোভাবের প্রতি তীব্র আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
এদিন বক্তব্য রাখতে গিয়ে অধ্যাপক প্রশান্ত মহলা জানান, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় কোর্স ওয়ার্ক শেষ করার পর ছাত্র-ছাত্রীরা কোন বিষয়ে গবেষণা করবেন, তাও শিক্ষকদের কাছে জানতে চান। তিনি স্পষ্ট জানান, গবেষণার বিষয়বস্তু নির্বাচন করার প্রাথমিক দায়িত্ব ছাত্রেরই। একই বিষয়ে বারবার কাজ হওয়া বা ‘ডুপ্লিকেসি’ এড়াতে তিনি ‘লিটারেচার রিভিউ’ বা পূর্ববর্তী কাজের পর্যালোচনার ওপর বিশেষ জোর দেন।ছাত্র-ছাত্রীদের লাইব্রেরি বিমুখতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে গবেষণার জন্য আধুনিক ই-জার্নাল (E-Journal) সাবস্ক্রিপশন করেছে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, ছাত্র-ছাত্রীরা লাইব্রেরিতে গিয়ে বই পড়ার বদলে মোবাইল ঘাটতেই বেশি ব্যস্ত থাকে। বই ইস্যু করার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে।”তিনি আরও বলেন বই-ই জ্ঞানের উৎস।




লাইব্রেরি অভিমুখী না হলে প্রকৃত গবেষণা সম্ভব নয়।সবশেষে এ দিন গবেষণার নৈতিকতা ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করলেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য তথা বিশিষ্ট ভাষাবিদ অধ্যাপক পবিত্র ভূষণ সরকার। এদিন তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের কেবল পুঁথি নিয়ে চর্চা নয়, বরং তার ঐতিহাসিক সংরক্ষণের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।পবিত্র ভূষণ সরকার বলেন, “পুঁথি নিয়ে গবেষণা করার অর্থ হলো একটি বিশাল দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া। এই অমূল্য সম্পদকে রক্ষা করে সাধারণ মানুষের কাছে তার গুরুত্ব পৌঁছে দিতে হবে।” এই প্রসঙ্গে তিনি একটি অত্যন্ত জরুরি তথ্য গবেষকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রাচীন পুঁথি ও পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণের জন্য ভারত সরকারের ‘ন্যাশনাল আর্কাইভস’ (National Archives) সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দায়িত্ব গ্রহণ করছে। সাধারণ মানুষ বা গবেষকদের কাছে কোনো দুষ্প্রাপ্য পুঁথি থাকলে তা এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা সম্ভব।ভাষাবিদ হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের বাংলা ভাষার উচ্চারণগত ও ভাষাগত ত্রুটি নিয়েও এদিন সতর্ক করেন তিনি। গবেষণাপত্র লেখার সময় এবং কথা বলার ক্ষেত্রে সঠিক উচ্চারণ ও ব্যাকরণ মেনে চলা যে একজন গবেষকের প্রাথমিক পরিচয়, তা তিনি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন।অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আয়োজিত হয় একটি বিশেষ প্রশ্নোত্তর পর্ব। সেখানে ছাত্র-ছাত্রীরা গবেষণা এবং পুঁথিবিদ্যা সংক্রান্ত নানা সমস্যার কথা সরাসরি পবিত্র সরকারের সামনে তুলে ধরেন। অত্যন্ত সহজভাবে তিনি প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেন এবং শিক্ষার্থীদের সংশয় দূর করেন।
