মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আঁচ কালিয়াগঞ্জে! আতঙ্কে বেড়েছে গ্যাস বুকিং, দামও বাড়ল এক ধাক্কায়


তন্ময় চক্রবর্তী :- মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেই প্রভাব এবার পড়তে শুরু করেছে বাঙালির হেঁশেলেও। উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জে আতঙ্কে আগাম রান্নার গ্যাস বুকিং করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে বলে জানাচ্ছেন গ্যাস ডিলাররা।ডিলার সূত্রে জানা গিয়েছে, সাধারণ সময়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ গ্যাস বুকিং হতো, যুদ্ধ পরিস্থিতির খবর সামনে আসার পর তা অনেকটাই বেড়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে কিংবা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই আগেভাগে সিলিন্ডার বুকিং করে রাখার হিড়িক পড়েছে।এরই মধ্যে রান্নার গ্যাসের দামও বেড়েছে। আগে একটি গৃহস্থালির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল প্রায় ৯৬০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০২০ টাকায়। অর্থাৎ এক ধাক্কায় প্রায় ৬০-৭০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

দাম বাড়লেও বুকিংয়ের চাহিদা কমেনি, বরং আতঙ্কের জেরে অনেকেই দ্রুত সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে চাইছেন।কালিয়াগঞ্জের এক গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটর জানান,“আগে প্রতিদিন যে সংখ্যক বুকিং আসত, এখন তা অনেকটাই বেড়ে গেছে।

তবে এখনও পর্যন্ত তেল কোম্পানির পক্ষ থেকে সরবরাহ কমানোর কোনও নির্দেশ আসেনি। যুদ্ধের খবর দেখেই মানুষ আগাম বুকিং করছেন।”এই পরিস্থিতিতে কিছু ডিলার গ্রাহকদের জানিয়ে দিয়েছেন, একটি সিলিন্ডার ডেলিভারি নেওয়ার অন্তত ২৫ দিন পর আবার নতুন করে বুকিং করা যাবে।

যদিও এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত সরকারি কোনও স্পষ্ট নির্দেশিকা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।স্থানীয় এক বাসিন্দার কথায়,“টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমে প্রতিনিয়ত যুদ্ধের খবর দেখেই মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। যদি ভবিষ্যতে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে সমস্যা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষেরই ভোগান্তি বাড়বে।”বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। বিশ্বের বড় অংশের তেল ও গ্যাস সরবরাহ আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে। ফলে সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে পরিবহণ ব্যবস্থা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।ভারত বছরে প্রায় ৩ কোটি ১৫ লক্ষ টন এলপিজি ব্যবহার করে। এর মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালিতে। তবে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৬২ শতাংশই আমদানির উপর নির্ভরশীল। আর সেই আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে পশ্চিম এশিয়া থেকে, যার প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী। ফলে ওই অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলেই তার প্রভাব পড়ে ভারতের জ্বালানি বাজারে।এদিকে কেন্দ্রীয় সরকার আগেই জানিয়েছিল যে দেশে প্রায় ৭০ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। তবুও সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক একটি উচ্চপর্যায়ের রিভিউ কমিটি গঠন করেছে। পাশাপাশি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইন, ১৯৫৫ অনুযায়ী গ্যাসের সরবরাহ, বণ্টন ও মজুতের উপর নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।সূত্রের খবর, গত ছ’মাসের গড় সরবরাহের ৭০-৮০ শতাংশ গ্যাস আপাতত সার কারখানা, শিল্প ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রকে দেওয়া হবে। তবে গৃহস্থালির পাইপলাইন গ্যাস এবং যানবাহনের সিএনজি সরবরাহ ১০০ শতাংশ বহাল রাখার কথা জানানো হয়েছে।গ্যাস সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন শহরের হোটেল ও রেস্তরাঁ ব্যবসায় পড়তে শুরু করেছে। মুম্বই, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, চেন্নাই সহ একাধিক শহরে বহু হোটেল আংশিক বা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে বলে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির দাবি। অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিগুণ দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে খাদ্য ব্যবসায়ীদের।সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট—এই তিনের মিলিত প্রভাবেই কালিয়াগঞ্জ সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গ্যাস বুকিংয়ের হিড়িক পড়েছে। আর এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।