প্লাস্টিকের দাপটের বিরুদ্ধে কালিয়াগঞ্জে ‘সবুজ বিপ্লব’! ভুট্টার দানা থেকে তৈরি পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগে নতুন আশার আলো
তন্ময় চক্রবর্তী কালিয়াগঞ্জ, ৮ সেপ্টেম্বর:প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগের রমরমা বাজারে লাগাম টানতে এবার উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জে শুরু হয়েছে এক অভিনব উদ্যোগ।
প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে ভুট্টার দানার বিশেষ প্রক্রিয়াজাত পাউডার থেকে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগ। কালিয়াগঞ্জ ব্লকের পূর্বভান্ডার গ্রামের নেক্সোরা গ্লোবাল কম্পোস্টেবল, বায়োডিগ্রেডেবল ব্যাগ ও কাগজের ব্যাগ প্রস্তুতকারী কারখানায় তৈরি হওয়া এই নতুন ধরনের ক্যারিব্যাগ ঘিরে ইতিমধ্যেই আশার আলো দেখছেন পরিবেশপ্রেমী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ।প্লাস্টিক দূষণ বর্তমানে পরিবেশের অন্যতম বড় সমস্যা। ব্যবহারের পর প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ বছরের পর বছর পরিবেশে থেকে মাটি, জল এবং জীববৈচিত্র্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কালিয়াগঞ্জের প্রত্যন্ত গ্রামে ভুট্টার দানা থেকে পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগ তৈরির উদ্যোগকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।পূর্বভান্ডার গ্রামের কারখানায় তৈরি হচ্ছে এই বিশেষ ক্যারিব্যাগ। কারখানার উদ্যোগপতি প্রীতম আগারওয়াল জানান, ভুট্টার দানার বিশেষ প্রক্রিয়াজাত পাউডার ব্যবহার করেই এই পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, সাধারণ প্লাস্টিকের তুলনায় এই ব্যাগ পরিবেশের পক্ষে অনেক বেশি নিরাপদ এবং ব্যবহারের পর সহজেই পচনশীল।
পরিবেশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রায় তিন মাসের মধ্যে এই ধরনের ব্যাগ নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলেও জানান তিনি।এই অভিনব শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল বর্তমানে গুজরাট থেকে আনতে হচ্ছে। প্রীতম আগারওয়াল জানান, গুজরাট থেকে ভুট্টার দানার বিশেষ প্রক্রিয়াজাত পাউডার এনে তা ব্যবহার করে কারখানায় পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে।
তবে উত্তর দিনাজপুরে এখনও এই পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগের বাজার পুরোপুরি তৈরি হয়নি। ফলে স্থানীয় বাজারে চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও কারখানার উৎপাদিত ব্যাগ ইতিমধ্যেই জেলার গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতা এবং সিকিমে পাঠানো হচ্ছে। আগামী দিনে পরিবেশ সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা যত বাড়বে, ততই এই ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হবে বলে আশাবাদী কারখানা কর্তৃপক্ষ।উদ্যোগপতি প্রীতম আগারওয়ালের বক্তব্য, এই ধরনের শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সরকারি সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর আশা, সরকার যদি পরিবেশবান্ধব শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, পরিকাঠামো ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে কালিয়াগঞ্জে এই শিল্পকে আরও বৃহৎ আকারে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।তাঁর মতে, এর ফলে শুধু প্লাস্টিক দূষণ কমানোর ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না, পাশাপাশি স্থানীয় যুবক-যুবতীদের জন্য তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।
প্রত্যন্ত এলাকায় এমন শিল্প গড়ে উঠলে এলাকার আর্থিক উন্নয়নেও তার প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন তিনি।কালিয়াগঞ্জে পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগ তৈরির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এলাকার সাধারণ মানুষও। তাঁদের বক্তব্য, পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি দূষণমুক্ত পৃথিবী উপহার দেওয়ার জন্য এখন থেকেই বিকল্প ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগের ব্যবহার বাড়লে একদিকে যেমন প্লাস্টিক দূষণ কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের সামনে একটি সুন্দর ও সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলার আশার আলো দেখা দেবে।

তাই বাজারে এই ধরনের পণ্যের ব্যবহার আরও বাড়ানো দরকার।একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের একাংশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, শুধু পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগ তৈরি করলেই হবে না, পাশাপাশি যেসব কারখানায় নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ তৈরি হচ্ছে, সেগুলির বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।স্থানীয়দের দাবি, কালিয়াগঞ্জে যেসব কারখানা থেকে নিষিদ্ধ ক্যারিব্যাগ উৎপাদন হচ্ছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেগুলি চিহ্নিত করে দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া হোক।
তাহলেই পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগের বাজার তৈরি হবে এবং সাধারণ মানুষও প্লাস্টিকের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন।স্থানীয়দের আরও বক্তব্য, প্রশাসন যদি একদিকে নিষিদ্ধ প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধে কঠোর হয় এবং অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব ক্যারিব্যাগ তৈরির মতো উদ্যোগকে উৎসাহ দেয়, তাহলে কালিয়াগঞ্জ আগামী দিনে পরিবেশবান্ধব শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।সব মিলিয়ে, প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কালিয়াগঞ্জের পূর্বভান্ডার গ্রামের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। ভুট্টার দানা থেকে তৈরি ক্যারিব্যাগ যদি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে, তাহলে পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি তৈরি হবে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও। এখন সরকারি সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা—এই দুইয়ের হাত ধরেই এই উদ্যোগ কতটা বড় আকার ধারণ করে, সেটাই দেখার।






