দুর্গাপুজোর আগেই পদ্মের হাসি বিলে বিলে! ১০৮ পদ্মের আশায় বুক বাঁধছেন কালিয়াগঞ্জ-রায়গঞ্জের চাষিরা

তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ, ১৩ সেপ্টেম্বর: শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, ভোরের ঘাসে শিশিরের স্পর্শ আর বাতাসে আগমনী সুর। দুর্গাপুজোর আর মাত্র মাসখানেক বাকি।

 

পুজোর প্রস্তুতিতে যখন ব্যস্ত শহর থেকে গ্রাম, ঠিক তখনই উত্তর দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন বিল, জলাশয় ও নিচু জমিতে ফুটতে শুরু করেছে লাল-নীল পদ্ম। আর সেই পদ্মের সৌন্দর্যের সঙ্গে এবার জড়িয়ে রয়েছে জেলার বহু চাষির অর্থনৈতিক স্বপ্নও।বিশেষ করে মহাষ্টমীর সন্ধিপুজোয় দেবীর আরাধনায় প্রয়োজন হয় ১০৮টি পদ্ম।

 

ফলে পুজোর সময় পদ্মফুলের চাহিদা আচমকাই কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সেই বিপুল চাহিদার কথা মাথায় রেখেই এখন থেকেই দিনরাত এক করে পদ্ম চাষের পরিচর্যায় ব্যস্ত কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ ও ইটাহারের স্থানীয় পদ্ম চাষিরা। বিলের জলে বড় বড় সবুজ পাতা আর তার মাঝখানে ফুটে ওঠা পদ্মের কুঁড়ি দেখে ইতিমধ্যেই আশার আলো দেখছেন তাঁরা।গত কয়েক বছরে দুর্গাপুজোর সময় স্থানীয় বাজারে পদ্মের জোগান কম থাকায় ভিনজেলার উপর নির্ভর করতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।

 

হাওড়া, কোলাঘাট এমনকি ওড়িশা ও বিহারের বিভিন্ন এলাকা থেকেও পদ্মফুল এনে জেলার বাজারের চাহিদা মেটানো হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হিমঘরে সংরক্ষিত ফুলের উপর নির্ভর করতে হয়েছে ফুল ব্যবসায়ীদের। ফলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত টাটকা পদ্মের সঙ্গে সেই ফুলের গুণমান ও সতেজতার পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।তবে চলতি বছরে পরিস্থিতি অনেকটাই আশাব্যঞ্জক বলে মনে করছেন চাষিরা। কালিয়াগঞ্জের সীমান্ত সংলগ্ন নিচু এলাকা, রায়গঞ্জ ও ইটাহারের বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক বিলগুলিতে আবহাওয়া এখনও পর্যন্ত পদ্ম চাষের অনুকূলে রয়েছে। কোথাও বড় বড় পাতায় জলাশয় ঢেকে গিয়েছে, আবার কোথাও সেই পাতার ফাঁক দিয়ে মাথা তুলেছে পদ্মের কুঁড়ি। আগামী কয়েক সপ্তাহ আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দুর্গাপুজোর সময় প্রচুর পরিমাণে স্থানীয় পদ্ম বাজারে আসতে পারে বলে আশা করছেন চাষিরা।দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে কালিয়াগঞ্জে পদ্ম চাষের সঙ্গে যুক্ত চাষি সুভাষ সরকার ও অমল প্রামাণিক জানান, আষাঢ় মাসে পদ্মের কন্দ রোপণ করা হয়েছিল।

 

সেই কন্দ থেকেই বর্তমানে বড় বড় পাতা বেরিয়েছে এবং একের পর এক কুঁড়ি আসতে শুরু করেছে। তাঁদের কথায়, “এবার এখনও পর্যন্ত পদ্মের ফলন খুবই ভালো হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। আগামী এক মাস যদি বড় কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অসময়ের ভারী বৃষ্টি না হয়, তাহলে স্থানীয় পদ্ম দিয়েই জেলার সিংহভাগ চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।”চাষিদের বক্তব্য, পদ্ম চাষ দেখতে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটা নয়। জলাশয়ের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা থেকে শুরু করে কন্দ রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, জলস্তর ঠিক রাখা এবং ফুল তোলার কাজ—সবকিছুর জন্যই প্রয়োজন সময় ও পরিশ্রম। অথচ পুজোর মরসুম ছাড়া বছরের অন্যান্য সময়ে পদ্মের বাজার তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাই দুর্গাপুজোর মরসুমটাই পদ্ম চাষিদের কাছে বাড়তি আয়ের বড় সুযোগ।কালিয়াগঞ্জের তারাবাজার এলাকার ফুল ব্যবসায়ীরাও এবারের ফলন নিয়ে আশাবাদী। তাঁদের মতে, পুজোর সময় পদ্মের চাহিদা অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে যায়। বিশেষ করে অষ্টমীর সন্ধিপুজোয় ১০৮টি পদ্মের প্রয়োজন হওয়ায় একই সঙ্গে প্রচুর ফুলের চাহিদা তৈরি হয়। স্থানীয় বিলে উৎপাদিত সদ্য তোলা পদ্মের রং, সৌন্দর্য ও সতেজতা সাধারণত বেশি থাকে। ফলে পুরোহিত থেকে শুরু করে ভক্তদের মধ্যেও টাটকা পদ্মের চাহিদা বেশি।ফুল ব্যবসায়ীদের কথায়, “স্থানীয়ভাবে প্রচুর পদ্ম পাওয়া গেলে বাইরে থেকে ফুল আনতে হবে না। এতে একদিকে যেমন পরিবহণের খরচ কমবে, অন্যদিকে স্থানীয় চাষিরাও তাঁদের উৎপাদিত ফুলের ভালো দাম পাবেন। পুজোর সময় টাটকা পদ্মের চাহিদা বরাবরই থাকে।”তবে পদ্মের দাম নিয়ে এখন থেকেই চাষি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে চলছে নানা হিসেব-নিকেশ। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে একটি পদ্মফুলের দাম প্রায় ৫ থেকে ৮ টাকা। কিন্তু দুর্গাপুজো যত এগিয়ে আসবে এবং বিশেষ করে মহাষ্টমীর দিন চাহিদা বাড়লে সেই দাম অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে। চাষি ও ব্যবসায়ীদের অনুমান, অষ্টমীর সকালে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রতি পদ্মের দাম ১৫ থেকে ৩০ টাকা, এমনকি জোগানের ঘাটতি হলে তারও বেশি হতে পারে।চাষিদের কাছে তাই আগামী এক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিবৃষ্টি, ঝড় কিংবা কোনও ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে পদ্মের ফলন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তেমনই সময়মতো ফুল ফুটতে না পারলেও সমস্যায় পড়তে হবে। আবার আবহাওয়া অনুকূলে থেকে পর্যাপ্ত ফুল ফুটলে পুজোর বাজারে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।একদিকে ভিনরাজ্য ও ভিনজেলার হিমঘরে সংরক্ষিত পদ্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে নিজেদের জলাশয়ে উৎপাদিত টাটকা ফুলের সঠিক দাম পাওয়ার প্রত্যাশা—এই দুইয়ের মাঝেই এখন দাঁড়িয়ে উত্তর দিনাজপুরের পদ্ম চাষিরা। দুর্গাপুজোর আর মাত্র এক মাস আগে বিলের জলে ফুটে থাকা লাল-নীল পদ্ম তাই শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, বহু কৃষক পরিবারের কাছে বাড়তি রোজগারের আশার প্রতীকও।সব মিলিয়ে, শরতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিনাজপুরের বিলগুলিতে ফুটে ওঠা পদ্ম যেন বলে দিচ্ছে—এবার পুজোর বাজারে ভিনরাজ্যের ফুল নয়, স্থানীয় টাটকা পদ্মেই ভরে উঠুক জেলার ফুলের বাজার। আর সেই প্রত্যাশাতেই এখন পুজোর কাউন্টডাউন শুরু করে দিয়েছেন কালিয়াগঞ্জ, রায়গঞ্জ ও ইটাহারের পদ্ম চাষিরা।