ঝাঁ চকচকে পরিকাঠামো, তবু শিক্ষকহীন শিক্ষা—অতিথি শিক্ষকের ভরসায় চলছে মালগাঁও গভর্নমেন্ট ইংরেজি মিডিয়াম স্কুল

তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ, উত্তর দিনাজপুর | ২৮ জানুয়ারি:উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ ব্লকের মালগাঁও অঞ্চলে ১১ বিঘা জমির উপর গড়ে ওঠা কালিয়াগঞ্জ গভর্নমেন্ট মডেল ইংরেজি বিদ্যালয় আজ এক বিস্ময়কর বাস্তবতার মুখোমুখি। ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে যাত্রা শুরু করা এই সরকারি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়টি গত পাঁচ বছর ধরে সম্পূর্ণভাবে অতিথি শিক্ষকদের উপর নির্ভর করেই পরিচালিত হয়ে আসছে—যা সচরাচর সরকারি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বিরল।বর্তমানে বিদ্যালয়টি পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের স্বীকৃত একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পঞ্চম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান হয় এবং বর্তমানে মোট ৮২ জন ছাত্রছাত্রী এখানে পড়াশোনা করছে।বিদ্যালয়ের পরিকাঠামো অত্যাধুনিক ও ঝাঁ চকচকে হলেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় জর্জরিত এই প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, বিদ্যালয়ে এখনও পর্যন্ত একজনও স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ করা হয়নি।

 

 

সাতজন অতিথি শিক্ষক দিয়েই একটি বড় মাপের সরকারি ইংরেজি বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে চালানো কার্যত অসম্ভব বলেই মত শিক্ষা মহলের একাংশের।এছাড়াও বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলের জন্য আলাদা রান্নাঘর ও খাবার খাওয়ার নির্দিষ্ট জায়গা নেই। শুধু তাই নয়, বিগত চার বছর ধরে বিদ্যালয়ে প্রবেশের জন্য কোনও পাকা রাস্তার ব্যবস্থাও নেই, যা ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকদের কাছে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

 

 

বিদ্যালয়ের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রঞ্জন মোদক এক সাক্ষাৎকারে জানান,বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা স্কলারশিপ, কন্যাশ্রী, সবুজ সাথীর সাইকেল, বিনামূল্যে পাঠ্যবই, বিদ্যালয়ের ইউনিফর্ম ও মিড ডে মিলসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পেয়ে থাকে।তবে তিনি স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেন,“এই বিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্থায়ী শিক্ষক না থাকা।

 

 

সাতজন অতিথি শিক্ষক দিয়ে একটি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় দীর্ঘদিন চালানো সম্ভব নয়। তবুও আমরা যারা অতিথি শিক্ষক, অত্যন্ত যত্ন সহকারে আমাদের দায়িত্ব পালন করে চলেছি।”তিনি আরও জানান, বিদ্যালয়ে বর্তমানে কোনও প্রাচীর নেই, যা ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গুরুতর উদ্বেগের কারণ। দ্রুত বিদ্যালয় প্রাচীর নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি জোর দিয়ে বলেন।রঞ্জন মোদক জানান, তাঁর যোগদানের পূর্বে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। বিদ্যালয়ের সূচনালগ্ন থেকেই দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব সামলানো এই শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সম্প্রতি বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়।বিদ্যালয়ের পরিচালন কমিটি সম্পর্কে জানতে চাইলে রঞ্জন মোদক জানান,বিদ্যালয়ের সভাপতি হলেন রায়গঞ্জের মহকুমা শাসক তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও পরিচালন কমিটিতে রয়েছেন ডিআই অফ স্কুল, ডিস্ট্রিক্ট এডুকেশনাল অফিসার এবং কালিয়াগঞ্জ ব্লকের সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক।বিদ্যালয় এলাকার একাধিক বাসিন্দা, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, জানান—তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে অতিথি শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় চালানোর বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না। তাঁদের মতে,“ভালো ছাত্রছাত্রী তখনই ভর্তি হবে, যখন বিদ্যালয়ে স্থায়ী ও দক্ষ শিক্ষক থাকবেন। শুধু ঝাঁ চকচকে বিল্ডিং দেখেই কোনও অভিভাবক সন্তানকে এখানে ভর্তি করবেন না।”এলাকাবাসীর অভিযোগ, ২০২২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগে কোনও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এত সুন্দর একটি সরকারি ইংরেজি বিদ্যালয় থাকলেও শিক্ষক সংকটের কারণে তার সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।এলাকার বিশিষ্টজনদের একাংশের স্পষ্ট দাবি,শুধু অতিথি শিক্ষক নয়, অবিলম্বে একাধিক স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। তবেই মালগাঁও গভর্নমেন্ট ইংরেজি বিদ্যালয় গ্রামের মধ্যেই একটি আদর্শ ও স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারবে।