কাঁটাতারের বেড়া থামাতে পারেনি মায়ের আরাধনা! ডাকাত দলও পারেনি উদগ্রামে ডাকাতি—৪০০ বছর ধরে জাগ্রত বিশ্বাসে পূজিত মা দুর্গা
তন্ময় চক্রবর্তী :একদিকে ভারত-বাংলাদেশের কাঁটাতারের বেড়া, অন্যদিকে শতাব্দীপ্রাচীন এক দুর্গামন্দির। দেশভাগ বদলে দিয়েছে সীমান্তের মানচিত্র, বদলে দিয়েছে মানুষের পরিচয় ও প্রশাসনিক সীমানা।
কিন্তু বদলাতে পারেনি উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জের রাধিকাপুর এলাকার উদগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লোকবিশ্বাস, ভক্তি আর পুরনো রীতিনীতি আঁকড়ে আজও এখানে মহাসমারোহে পূজিত হয়ে আসছেন মা দুর্গা।আর এই পুজোকে ঘিরে সবচেয়ে চর্চিত যে কাহিনি, তা হল—স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, মায়ের মহিমার কারণে একসময় ডাকাত দল উদগ্রাম গ্রামে ঢুকেও ডাকাতি করতে পারেনি।
বাপ-ঠাকুরদার মুখে মুখে চলে আসা এই কাহিনি আজও গ্রামের মানুষের বিশ্বাসের অন্যতম ভিত্তি। তাঁদের কাছে মা দুর্গা শুধু আরাধ্যার দেবী নন, তিনি যেন গোটা গ্রামের রক্ষাকর্ত্রী।স্থানীয় প্রবীণদের একাংশের মতে, উদগ্রামের এই দুর্গাপুজোর ইতিহাস প্রায় চারশো বছর বা তারও বেশি পুরনো।
আবার কিছু পুরনো প্রতিবেদনে এই পুজোকে পাঁচশো বছরেরও বেশি প্রাচীন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। পুজোর সঠিক প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে মতভেদ থাকলেও, উদগ্রামের মানুষের কাছে এই পুজোর প্রাচীনত্ব এবং ঐতিহ্য নিয়ে কোনও সংশয় নেই।
উদগ্রামের দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোককথাগুলির মধ্যে অন্যতম এই ডাকাতির কাহিনি। গ্রামের মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত বিশ্বাস, একসময় ডাকাতের দল গ্রামে ঢুকে লুটপাট করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু মায়ের অলৌকিক মহিমায় শেষ পর্যন্ত তারা সফল হতে পারেনি।
উদগ্রামের মানুষ বিশ্বাস করেন, মা দুর্গাই তাঁদের গ্রামকে ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।এই প্রসঙ্গেই বুধবার উদগ্রাম মায়ের মন্দিরে দেখা হয় উদগ্রাম দুর্গাপুজো কমিটির সদস্য হেমন্ত দাসের সঙ্গে। তিনি বলেন,“আমাদের বাপ-ঠাকুরদার কাছে শুনেছি, উদগ্রামের মা আমাদের গ্রাম পাহারা দেন। যাতে এই গ্রামে কেউ চুরি-ডাকাতি করতে না পারে, মা সেই রক্ষা করেন। ডাকাতের দল এসেও এই গ্রামে ডাকাতি করতে পারেনি—এই কথা আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি।
”হেমন্তবাবুর বক্তব্যে স্পষ্ট, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই লোকবিশ্বাসই আজও উদগ্রামের মানুষের কাছে মায়ের প্রতি ভক্তি ও আস্থাকে আরও গভীর করে তুলেছে।স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, একসময় অবিভক্ত দিনাজপুরের রাজবাড়ি থেকে কামান দাগার শব্দ শোনা যেত দুর্গাপুজোর সূচনার সংকেত হিসেবে। সেই কামানের গর্জন এপার বাংলার উদগ্রামে পৌঁছলেই শুরু হত দেবীর আরাধনার প্রস্তুতি।সময়ের স্রোতে রাজবাড়ি নেই, রাজত্ব নেই, নেই সেই কামানের গর্জনও। কিন্তু সেই ইতিহাসের স্মৃতি আজও বয়ে নিয়ে চলেছে উদগ্রামের দুর্গামন্দির।দেশভাগের পর ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া তৈরি হয়েছে। সীমান্তের বিভাজনে মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত জমির একাংশও ওপারে চলে যাওয়ার কথা পুরনো প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কিন্তু কাঁটাতারের বেড়া উদগ্রামের মানুষের বিশ্বাসকে ভাগ করতে পারেনি। বরং সীমান্তের এপারে আজও একই নিষ্ঠায় চলে মায়ের পুজো।উদগ্রামের দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, গ্রামবাসীর কাছে এটি এক বড় সামাজিক মিলনোৎসবও। কাজের সূত্রে যারা বছরের বিভিন্ন সময়ে বাইরে থাকেন, পুজোর সময় তাঁদের অনেকেই বাড়ি ফেরেন। ফলে পুজোর দিনগুলিতে গোটা গ্রাম যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।পুরনো রীতিনীতি মেনেই পুজোর বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়। পুজোর দিনগুলিতে মন্দিরকে ঘিরে ভক্তদের সমাগমও হয়। বহু মানুষ মায়ের কাছে পুজো দিতে এবং আশীর্বাদ নিতে আসেন।স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, উদগ্রামের মা দুর্গা অত্যন্ত জাগ্রত। জীবনের বিভিন্ন শুভ কাজের আগে মায়ের আশীর্বাদ নেওয়ার রীতি এখনও রয়েছে। বিয়ে, অন্নপ্রাশন কিংবা পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ কোনও শুভ অনুষ্ঠানের আগে মন্দিরে এসে মায়ের কাছে প্রার্থনা করেন বহু মানুষ।সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে পৃথিবী। বদলে গেছে সীমান্তের মানচিত্র। হারিয়ে গেছে রাজবাড়ি, থেমে গেছে কামানের গর্জন। কিন্তু উদগ্রামের মন্দিরে আজও শরতের আকাশে ঢাকের বাদ্যি শোনা যায়। ধূপ-ধুনোর গন্ধে, শঙ্খধ্বনিতে এবং ভক্তদের প্রার্থনায় জেগে ওঠে প্রাচীন মন্দির।ডাকাত দল মায়ের মহিমায় গ্রামে ঢুকেও সফল হতে পারেনি—এই লোকবিশ্বাস হোক বা ইতিহাসের কোনও অজানা অধ্যায়, উদগ্রামের মানুষের কাছে তা আজও মায়ের আশীর্বাদ ও রক্ষাকবচের প্রতীক।তাই উদগ্রামের দুর্গাপুজো শুধুমাত্র একটি শতাব্দীপ্রাচীন পুজো নয়। এটি সীমান্তের ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং গ্রামবাসীর গভীর ধর্মীয় আবেগের এক জীবন্ত দলিল।কাঁটাতারের বেড়া হয়তো দেশকে ভাগ করেছে, কিন্তু মায়ের প্রতি মানুষের বিশ্বাসকে ভাগ করতে পারেনি। প্রতি শরতে তাই আবারও ঢাকের তালে, শঙ্খের ধ্বনিতে জেগে ওঠে উদগ্রাম—“মা এসেছেন, গ্রাম পাহারা দিতে।”
