নেপালের রুদ্র প্রকৃতির ছবি মণ্ডপে, মানবতার বার্তা পুজোয়! ‘প্রকৃতিকে রক্ষা করুন, মানুষকে বাঁচতে দিন’—নসিরহাট-হরিহরপুরে ৫৭তম বর্ষে অনন্য ভাবনা

তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ, ২৪ সেপ্টেম্বর:প্রকৃতির রুদ্ররূপ যখন মুহূর্তের মধ্যে তছনছ করে দেয় মানুষের সাজানো সংসার, তখন তার অভিঘাত শুধু একটি দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। সেই ধ্বংসের ছবি ছুঁয়ে যায় গোটা মানবজাতির হৃদয়কে। স্বজন হারানোর কান্না, ঘর হারানোর অসহায়তা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—প্রকৃতির সেই নির্মমতার ছবি এবার দুর্গাপূজার মণ্ডপে তুলে ধরে মানবতার বার্তা দিতে চলেছে উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ শহর সংলগ্ন নসিরহাট-হরিহরপুর বারোয়ারি দুর্গোৎসব কমিটি।এবার তাদের ৫৭তম বর্ষের পুজোর মূল ভাবনা—নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করার আহ্বান।

 

মণ্ডপজুড়ে ফুটে উঠবে প্রকৃতির ধ্বংসাত্মক রূপ, বিপর্যস্ত মানুষের অসহায়তা এবং স্বজন হারানো পরিবারের যন্ত্রণার ছবি। সেই সঙ্গে দর্শনার্থীদের কাছে থাকবে এক গভীর আবেদন—‘প্রকৃতিকে রক্ষা করুন, মানুষকে বাঁচতে দিন।

’বৃহস্পতিবার পুজোমাঠে গিয়ে দেখা গেল, একদিকে কুমোরটুলির শিল্পীরা ব্যস্ত দুর্গাপ্রতিমাকে শেষ রূপ দিতে। অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি ঘরে মণ্ডপশিল্পীরা নেপালের প্রাকৃতিক দুর্যোগের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত।

 

তাঁদের হাতের কারুকাজে ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে বিপর্যস্ত জনজীবনের ছবি।পুজো কমিটির উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, দুর্গাপুজো শুধুমাত্র আনন্দ-উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথাও এই উৎসবের মাধ্যমে তুলে ধরা যায়। সেই ভাবনা থেকেই এবারের থিমে নেপালের দুর্যোগপীড়িত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা জানানো হচ্ছে।

 

নসিরহাট-হরিহরপুর দুর্গোৎসব কমিটির সম্পাদক শুভদীপ সরকার বলেন, তাঁদের পুজো এবার ৫৭ বছরে পদার্পণ করেছে। প্রতিবছরই সামাজিক উন্নয়ন, মানবিকতা এবং পরিবেশবান্ধব বার্তাকে সামনে রেখে থিম তৈরি করা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।

 

শুভদীপবাবুর কথায়, “আমরা চাই পুজোর আনন্দের পাশাপাশি মানুষ কিছু ভাবুন। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নষ্ট হলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, নেপালের দুর্যোগ আমাদের সেই বার্তাই দিচ্ছে। তাই মণ্ডপের মাধ্যমে মানুষকে প্রকৃতিকে রক্ষা করার আবেদন জানানো হচ্ছে।”এই পুজোর আরও একটি বিশেষ দিক হল—আগে থেকে নির্দিষ্ট কোনও বাজেট বেঁধে কাজ করা হয় না। মানুষের সহযোগিতা এবং পুজো কমিটির সদস্যদের উদ্যোগেই প্রতিবছর পুজোর আয়োজন এগিয়ে চলে। পুজোর কয়েকটি দিন মণ্ডপ চত্বরে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়।শুধু থিমেই নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রেও নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে এই পুজো। এবছরও দুস্থ পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেওয়া হবে বস্ত্র। থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও।মহাষ্টমীর দিন এই পুজোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় অন্যরকম আবহ। কালিয়াগঞ্জ শহর ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে বহু মানুষ মণ্ডপে এসে প্রসাদ গ্রহণ করেন। প্রশাসনের আধিকারিক থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে পুজোমণ্ডপ পরিণত হয় মিলনক্ষেত্রে।প্রতিবছরই দর্শনার্থীদের ভিড় এবং থিমের অভিনবত্বের কারণে জেলার অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠে নসিরহাট-হরিহরপুরের দুর্গোৎসব। রাজ্য সরকারের তরফে জেলার সেরা পুজোর স্বীকৃতিও অতীতে এই পুজোর ঝুলিতে এসেছে বলে উদ্যোক্তাদের দাবি।এবার তাই তাঁদের প্রত্যাশাও বেশি। তবে পুরস্কার বা স্বীকৃতির থেকেও বড় হয়ে উঠছে মানবতার বার্তা। মণ্ডপে নেপালের বিপর্যয়ের ছবি দেখে দর্শনার্থীরা যেন কয়েক মুহূর্ত থমকে দাঁড়ান, প্রকৃতির প্রতি নিজেদের দায়িত্বের কথা ভাবেন এবং দুর্যোগপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিকতা অনুভব করেন—এটাই উদ্যোক্তাদের মূল লক্ষ্য।দেবীর আরাধনার সঙ্গে এবার তাই নসিরহাট-হরিহরপুরে উচ্চারিত হবে মানবতার আহ্বান—প্রকৃতিকে ভালোবাসুন, প্রকৃতিকে বাঁচান, মানুষকে বাঁচতে দিন।