শুধু নিজের ভালো থাকা নয়, সমাজের সকলকে ভালো রাখার শপথ! রায়গঞ্জ গার্লস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘সেবা সংকল্প অভিযান’-এ পড়ুয়াদের মানবিকতার পাঠ
শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য হল সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করা। সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে শিক্ষা দপ্তরের নির্দেশ অনুসারে রায়গঞ্জ গার্লস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত হল বিশেষ ‘সেবা সংকল্প অভিযান’। বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অভিভাবকদের অংশগ্রহণে দিনভর বিভিন্ন সেবামূলক ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির মাধ্যমে পড়ুয়াদের মধ্যে মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সেবার মানসিকতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সেবা সংকল্প অভিযানের শুরুতেই পড়ুয়াদের বোঝানো হয়, বাড়ির বয়স্ক মানুষদের কীভাবে যত্ন ও সম্মান করা যায়। বাবা-মা, ঠাকুরদা-ঠাকুমা, দাদু-দিদা সহ পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে পাশে থাকার বার্তা দেওয়া হয়। তাঁদের সময়মতো জল দেওয়া, ওষুধ খাওয়ানো, খাবার পরিবেশন করা, তাঁদের সঙ্গে গল্প করা এবং একাকিত্ব দূর করতে সময় দেওয়ার মতো ছোট ছোট কাজও যে বড় ধরনের মানবিক সেবা হতে পারে, তা পড়ুয়াদের সামনে তুলে ধরা হয়।বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পড়ুয়াদের আরও শেখানো হয়, সেবা শুধুমাত্র নিজের পরিবার বা আপনজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমাজের আশপাশে থাকা ক্ষুধার্ত, অসহায়, দরিদ্র ও দুঃস্থ মানুষদের প্রতিও প্রত্যেকের দায়বদ্ধতা রয়েছে। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাঁদের খাবার, পোশাক কিংবা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে সাহায্য করার সংকল্প গ্রহণ করে ছাত্র-ছাত্রীরা।এই সেবা সংকল্প অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল—মানুষের পাশে দাঁড়াতে সবসময় বড় কিছু করার প্রয়োজন নেই। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট ছোট উদ্যোগও একজন অসহায় মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।এর পাশাপাশি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করতেও নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। একটি উন্নত, পরিচ্ছন্ন ও দায়িত্বশীল ভারত গড়ে তুলতে ছাত্র-ছাত্রীদের ভূমিকা কী হতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়।বিদ্যালয়ে আয়োজন করা হয় ডিবেট, কুইজ ও অঙ্কন প্রতিযোগিতা। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, জল সংরক্ষণ, বিদ্যুতের অপচয় রোধ এবং সমাজের প্রতি নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে পড়ুয়াদের সচেতন করা হয়।বিদ্যালয়ের অঙ্গনও পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ছাত্র-ছাত্রীদের নিজেদের স্কুল ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাস গড়ে তোলার বার্তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয়ভাবে জল নষ্ট না করা এবং বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ করার বিষয়েও সচেতন করা হয়।বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বক্তব্য, আগামী দিনের ভারত কেমন হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আজকের শিশুদের মানসিকতা ও মূল্যবোধের উপর। তাই ছোটবেলা থেকেই পড়ুয়াদের মধ্যে মানুষের প্রতি ভালোবাসা, বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শুধু নিজে ভালো থাকলেই হবে না, সমাজের প্রতিটি শ্রেণির মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের ভালো রাখার জন্যও আজীবন বিভিন্ন সেবামূলক কাজে এগিয়ে আসতে হবে। মানুষের বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের প্রতি নিজের দায়িত্ব পালন করাই একজন প্রকৃত নাগরিকের অন্যতম কর্তব্য।সেবা সংকল্প অভিযান’-এর মধ্য দিয়ে ছোট ছোট পড়ুয়াদের মনে সেই মানবিক মূল্যবোধের বীজ বপনেরই চেষ্টা করা হয়। পরিবারের প্রবীণ সদস্য থেকে শুরু করে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষ, আবার পরিবেশ থেকে দেশের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর প্রতিই দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয় ছাত্র-ছাত্রীদের।আর এই বার্তার মধ্য দিয়েই বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উচ্চারিত হয় এক গুরুত্বপূর্ণ সংকল্প—“সেবাই আমাদের পরম ধর্ম।”

