বিশ্বকর্মা পুজোর আগেই ‘বিশ্বকর্মাদের’ নতুন স্বপ্ন! পিএম বিশ্বকর্মা যোজনায় ভিনরাজ্যে উন্নত প্রশিক্ষণ, আত্মনির্ভরতার পথে কালিয়াগঞ্জের কারিগররা

তন্ময় চক্রবর্তী  বিশ্বকর্মা পুজোর আবহের মধ্যেই নতুন আশার আলো দেখছেন উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জের বহু প্রথাগত কারিগর ও শিল্পী। নিজেদের পেশাকে আরও আধুনিক ও সময়োপযোগী করে তুলতে এবার ভিনরাজ্যে গিয়ে উন্নত মানের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন তাঁরা। কেন্দ্র সরকারের পিএম বিশ্বকর্মা যোজনা প্রকল্পের মাধ্যমে এই প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়ে স্বভাবতই খুশি কালিয়াগঞ্জের কারিগররা।ইতিমধ্যেই কালিয়াগঞ্জের বেশ কয়েকজন বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত বিশ্বকর্মা প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এসেছেন।

তাঁদেরই একজন কালিয়াগঞ্জের মহেন্দ্রগঞ্জ এলাকার সেলুন ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ শীল। তাঁর কথায়, বর্তমান সময়ে মানুষের চাহিদা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। তাই শুধু চুল কাটা বা সাধারণ সেলুন পরিষেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রাহকদের আরও উন্নত পরিষেবা দেওয়াই এখন সময়ের দাবি।

আর সেই লক্ষ্যেই পিএম বিশ্বকর্মা যোজনার মাধ্যমে তিনি নিয়েছেন বিশেষ প্রশিক্ষণ।বিশ্বজিৎ শীল জানান, সম্প্রতি তিনি বিহারের কিষণগঞ্জে সাত দিনের প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশগ্রহণ করেন।

কালিয়াগঞ্জ থেকে মোট ১০ জন এই প্রশিক্ষণে যাওয়ার সুযোগ পান বলে তিনি জানান। প্রশিক্ষণ শিবিরে শুধুমাত্র তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়, হাতে-কলমে বা প্র্যাকটিক্যাল প্রশিক্ষণের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

 

মিঠুনের কথায়, প্রশিক্ষণে বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে কীভাবে চুল কাটা হয়, চুলে বিভিন্ন ধরনের কালার কীভাবে করা যায়, ফেসিয়াল, হেয়ার স্ট্রেটনিং, চুলে ভিটামিন ও অন্যান্য আধুনিক পরিষেবা কীভাবে দেওয়া যায়—এসব বিষয়ে বিস্তারিতভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

 

ফলে প্রশিক্ষণ শেষে নিজের সেলুনে ফিরে এসে আরও আধুনিক পরিষেবা দেওয়ার ব্যাপারে তিনি আত্মবিশ্বাসী।শুধু প্রশিক্ষণই নয়, প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীদের উৎসাহিত করতে দেওয়া হচ্ছে শংসাপত্রও।

 

সাত দিনের প্রশিক্ষণ শেষে বিশ্বজিৎ শীলের হাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবি সম্বলিত শংসাপত্র তুলে দেওয়া হয়। এই শংসাপত্র পেয়ে তিনি অত্যন্ত খুশি বলে জানান।মিঠুন শীল বলেন, “বর্তমান যুগে মানুষের চাহিদা অনেক বেড়েছে। তাই সেলুন ব্যবসাকেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক করতে হবে। পিএম বিশ্বকর্মা যোজনার মাধ্যমে যে প্রশিক্ষণ পেলাম, তাতে গ্রাহকদের আরও উন্নত পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

 

এতে যেমন গ্রাহকরা উপকৃত হবেন, তেমনই আমাদের মতো ছোট ব্যবসায়ীরাও নিজেদের পেশাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন।”প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগের প্রশংসা করে বিশ্বজিৎ শীল আরও বলেন, তাঁদের মতো প্রথাগত শিল্পী ও কারিগরদের কথা চিন্তা করে এই ধরনের প্রকল্প চালু করায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ। তাঁর মতে, শুধু আর্থিক সাহায্য নয়, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগই একজন কারিগরকে দীর্ঘমেয়াদে আত্মনির্ভর করে তুলতে পারে।

জানা গিয়েছে, প্রশিক্ষণ চলাকালীন অংশগ্রহণকারীদের জন্য প্রশিক্ষণ ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে। বিশ্বজিৎ শীল জানান, সাত দিনের প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার জন্য থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য বিষয় মিলিয়ে মোট প্রায় ৬,৫০০ টাকা প্রশিক্ষণ ভাতা দেওয়া হয়েছে।এর পাশাপাশি প্রশিক্ষণ পর্ব সম্পূর্ণ হলে সেলুন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের প্রায় ১৫ হাজার টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের আধুনিক চুল কাটার যন্ত্রপাতি দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে তিনি জানান।গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই যন্ত্রপাতির জন্য ভবিষ্যতে কোনও টাকা শোধ করতে হবে না বলেও জানা গিয়েছে।শুধু সরঞ্জাম প্রদান নয়, পিএম বিশ্বকর্মা যোজনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ব্যবসা সম্প্রসারণ ও স্বনির্ভরতার জন্য ঋণ সহায়তার ব্যবস্থাও রয়েছে। মিঠুন শীলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্যোগ গ্রহণকারীরা ধাপে ধাপে আর্থিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রথম পর্যায়ে ১ লক্ষ টাকা, পরবর্তী পর্যায়ে ২ লক্ষ টাকা এবং আরও পরবর্তী পর্যায়ে ৩ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ সহায়তার কথা জানানো হয়েছে। ঋণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে সুদের ব্যবস্থাও রয়েছে বলে তিনি জানান।বিশ্বজিৎ শীলের মতো কালিয়াগঞ্জের বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রথাগত কারিগরের কাছে এই প্রকল্প তাই শুধুমাত্র একটি সরকারি প্রকল্প নয়—বরং নিজেদের পেশাকে আধুনিক করে তোলার নতুন সুযোগ। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বংশপরম্পরায় চলে আসা বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে মূলস্রোতের অর্থনীতির সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।বিশ্বকর্মা পুজোর আগে কালিয়াগঞ্জের ‘বিশ্বকর্মাদের’ এই নতুন অভিজ্ঞতা তাই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মেলবন্ধন ঘটিয়ে আগামী দিনে তাঁরা নিজেদের ব্যবসা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন—এমনটাই আশা বিশ্বজিৎ শীলদের।