পরিযায়ী পাখির কলতানে মুখর কুলিক! শুরু হল এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পাখি গণনা, এবার সংখ্যাবৃদ্ধির আশায় বনদপ্তর

রায়গঞ্জ, ৫ সেপ্টেম্বর: প্রতি বছরের মতো এবারও শুরু হল উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কুলিক পক্ষী নিবাসে পরিযায়ী পাখি গণনার কাজ। ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর—দু’দিন ধরে চলবে এই পাখি গণনা। শনিবার সকাল ৭টা থেকেই বনদপ্তরের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় গণনার কাজ। আকাশ মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি না হওয়ায় পাখি গণনায় প্রকৃতির কোনও বাধা তৈরি হয়নি।প্রতি বছর বর্ষা শেষে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি এসে আশ্রয় নেয় কুলিক পক্ষী নিবাসে।

 

কলকাকলিতে এই সময় কার্যত মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ পরিযায়ী পাখির আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত কুলিক পক্ষী নিবাস তাই প্রতিবছরই প্রকৃতিপ্রেমী, পক্ষীপ্রেমী ও পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।পাখি গণনার আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছিল বনদপ্তর। পক্ষীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত গাছগুলিতে নাম্বারিং করার কাজ সম্পন্ন করা হয়। কোন গাছে কতগুলি পাখি রয়েছে, কোন এলাকায় পাখির ঘনত্ব বেশি—এই সমস্ত তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত করার জন্য নির্দিষ্ট গাছগুলির নম্বর দেওয়া হয়। সেই কাজ শেষ হওয়ার পরই চলতি বছরের পাখি গণনার দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়।শনিবার প্রথম দিনের গণনায় কুলিক পক্ষী নিবাসের ভিতরের বিভিন্ন গাছ ছাড়াও রাজ্য সড়কের দু’ধারে থাকা গাছগুলিতে আশ্রয় নেওয়া পরিযায়ী পাখিদেরও গণনা করা হয়। গণনায় অংশগ্রহণকারী সদস্যদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে পক্ষী নিবাসের বিভিন্ন জোনে পাঠানো হয়। প্রত্যেকটি দল নির্দিষ্ট এলাকায় পাখিদের সংখ্যা, প্রজাতি এবং অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে তথ্য সংগ্রহ করে।বনদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, এবছর পাখি গণনাকে ঘিরে বিশেষ আশাবাদী বনকর্মী ও পক্ষীপ্রেমীরা। বছরের শুরু থেকেই ভালো বৃষ্টিপাত হওয়ায় কুলিক পক্ষী নিবাসের পরিবেশ পরিযায়ী পাখিদের জন্য আরও অনুকূল হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার পরিযায়ী পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।গত বছর কুলিক পক্ষী নিবাসে মোট ১ লক্ষ ৫৮টি পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছিল। এবছর সেই সংখ্যা আরও বাড়বে বলেই প্রত্যাশা বনদপ্তর থেকে শুরু করে পক্ষীপ্রেমীদের। তবে চূড়ান্ত সংখ্যা জানতে দু’দিনের গণনা সম্পূর্ণ হওয়ার পর সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করতে হবে।কুলিকের জলাভূমি ও সবুজ পরিবেশে এবারও দেখা মিলছে বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখির। শামুকখোল, পানকৌড়ি, নাইট হেরন, বিভিন্ন প্রজাতির ইগ্রেট-এর পাশাপাশি নজরে পড়েছে অপেক্ষাকৃত আকর্ষণীয় গ্লসি আইবিস এবং ব্ল্যাক-হেডেড আইবিস-এর মতো পাখিও।

 

ফলে এবছর পাখির সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রজাতির বৈচিত্র্যও নজর কাড়ছে পক্ষী বিশেষজ্ঞদের।বনদপ্তরের আহ্বানে এবারের পাখি গণনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে উত্তর দিনাজপুর পিপল ফর অ্যানিমেলস, রায়গঞ্জ পিপল ফর অ্যানিমেলস, হিমালয়ান মাউনটেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকার্স অ্যাসোসিয়েশন, রায়গঞ্জ উৎকর্ষ ওয়াইল্ড লাইফ নেচার সোসাইটি, ‘ভোরের আলো’ এবং রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের এনসিসি বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা।পাখি গণনার কাজে উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় বনাধিকারিক ভূপেন বিশ্বকর্মা, রেঞ্জার সোভিক ঝা, উত্তর দিনাজপুর পিপল ফর অ্যানিমেলস-এর সম্পাদক গৌতম তান্তিয়া, রায়গঞ্জ পিপল ফর অ্যানিমেলস-এর সম্পাদক অজয় সাহা এবং রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ দেবজয় ভট্টাচার্য সহ অন্যান্যরা।এছাড়াও পাখি গণনার কাজে উপস্থিত ছিলেন পক্ষী বিশেষজ্ঞ বাসুদেব চক্রবর্তী, প্রবাহ চৌধুরী, অরূপ মিত্র ও দেবাশীষ দে-সহ একাধিক বিশেষজ্ঞ। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণকে কাজে লাগিয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে বিভিন্ন জোনে পাখি গণনা করা হয়।প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ কুলিক পক্ষী নিবাস। প্রতি বছর হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পরিযায়ী পাখিদের এখানে ফিরে আসা শুধু প্রকৃতির এক অপূর্ব দৃশ্যই নয়, বরং কুলিকের পরিবেশগত গুরুত্বকেও সামনে নিয়ে আসে। সেই কারণেই প্রতিবছরের পাখি গণনা শুধু সংখ্যার হিসাব নয়—কুলিকের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং পরিযায়ী পাখিদের নিরাপদ আবাসস্থলের বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্রও তুলে ধরে।দু’দিনের গণনা শেষে এবছর কুলিকে ঠিক কত সংখ্যক পরিযায়ী পাখি এসেছে, গত বছরের রেকর্ড কতটা ছাপিয়ে গেল এবং কোন কোন প্রজাতির উপস্থিতি কতটা বেড়েছে—সেদিকেই এখন নজর বনদপ্তর ও পক্ষীপ্রেমীদের।