১৮ বছরেও কাটল না জট! ১২ বিঘা জমিতে কোটি কোটি টাকার ‘এডিবয়েল ক্লাস্টার’—কালিয়াগঞ্জের সর্ষের তেলের স্বপ্ন কবে পূরণ হবে?

তপন চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ, ২৫ আগস্ট:এক সময় ‘সর্ষের তেলের কানপুর’ নামে পরিচিত ছিল কালিয়াগঞ্জ। সেই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা, খাঁটি সর্ষের তেল উৎপাদন এবং স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছিল কালিয়াগঞ্জ এডিবয়েল ক্লাস্টার প্রজেক্ট। কিন্তু দীর্ঘ ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও আজও পুরোপুরি চালু হয়নি কোটি কোটি টাকার এই বহু প্রতীক্ষিত প্রকল্প। ফলে একদিকে যেমন প্রশ্ন উঠছে প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে, তেমনই কালিয়াগঞ্জবাসীর মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা।কালিয়াগঞ্জ ব্লকের মুস্তাফানগর এলাকায় প্রায় ১২ বিঘা জমির উপর গড়ে ওঠার কথা এই ক্লাস্টার প্রকল্পের। প্রায় ৩৭ জন সর্ষের তেল ব্যবসায়ী একত্রিত হয়ে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নতমানের সর্ষের তেল উৎপাদন এবং একইসঙ্গে এলাকার বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।

পরিকল্পনার শুরু ২০০৮ সালে

জানা যায়, প্রকল্পের ভাবনা শুরু হয়েছিল ২০০৮ সালে। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পমন্ত্রী প্রয়াত মানব মুখার্জি কালিয়াগঞ্জের সর্ষের তেল মিল মালিকদের নিয়ে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকেই কালিয়াগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সর্ষের তেল শিল্পকে আধুনিক ও সংগঠিত করার লক্ষ্যে ক্লাস্টার প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে তৃণমূল সরকারের আমলে ‘কালিয়াগঞ্জ এডিবয়েল ক্লাস্টার প্রজেক্ট’ নামে প্রকল্পটি বাস্তব রূপ পায়। মুস্তাফানগরে প্রায় ১২ বিঘা জমি প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা হয়। এরপর ২০১৫ সালে রাজ্যের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকল্পের প্রাথমিক কাজের জন্য প্রায় ৫ কোটি ১২ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয় বলে ক্লাস্টার কর্তৃপক্ষের দাবি।

শুধু রাজ্য সরকার নয়, প্রকল্পটির জন্য কেন্দ্রের পক্ষ থেকেও প্রায় ৩ কোটি ৫৯ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল বলে জানান ক্লাস্টার কর্তৃপক্ষ। তবে নির্ধারিত সময়ে সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার করে কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে না পারায় কেন্দ্রের বরাদ্দ অর্থ ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে জানান ক্লাস্টারের সভাপতি তথা সর্ষের তেল ব্যবসায়ী সুজিত সরকার।

প্রকল্প পরিদর্শনে সরকারি প্রতিনিধি দল

সম্প্রতি রাজ্যের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তরের পক্ষ থেকে কৌশিক চক্রবর্তীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে। প্রতিনিধি দলে উত্তর দিনাজপুর জেলা শিল্প দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিফ জেনারেল ম্যানেজার সুরজিৎ দাসও ছিলেন।

প্রকল্পের বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন তাঁরা। সরকারি আধিকারিকদের বক্তব্যে নতুন করে আশার আলো দেখা গেলেও, এখনও মূল কাজ বাকি থাকায় উদ্বেগ কাটছে না।

বাকি শুধু মেশিনারি ও প্ল্যান্ট—আটকে টেন্ডারে!

ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প দপ্তরের আধিকারিক কৌশিক চক্রবর্তী জানান, এডিবয়েল ক্লাস্টার প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শেষের পথে। এবার প্রকল্পে মেশিনারি ও প্ল্যান্ট বসানোর কাজ বাকি রয়েছে।

তবে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এই কাজ সরাসরি করা সম্ভব নয়। মেশিনারি বসানোর জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সেই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলেই জানিয়েছেন তিনি।

হারিয়ে যাচ্ছে ‘সর্ষের তেলের কানপুর’-এর ঐতিহ্য

এক সময় কালিয়াগঞ্জের পরিচিতি ছিল সর্ষের তেলের শহর হিসেবে। শহর ও আশপাশে একাধিক সর্ষের তেল মিল ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই শিল্প অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, একসময় সর্ষের তেলে ভেজালের অভিযোগে কালিয়াগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সর্ষের তেলের বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে এডিবয়েল ক্লাস্টার প্রকল্প চালু হলে কালিয়াগঞ্জের হারিয়ে যাওয়া সর্ষের তেল শিল্প নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন শিল্পমহল।

চালু হলে তৈরি হতে পারে কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত

প্রকল্পটি সম্পূর্ণ চালু হলে আধুনিক প্রযুক্তিতে উন্নতমানের ও খাঁটি সর্ষের তেল উৎপাদন, বাজার সম্প্রসারণ এবং বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে কালিয়াগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী সর্ষের তেল শিল্পও নতুন পরিচয় পেতে পারে।

ক্লাস্টারের সভাপতি সুজিত সরকার বলেন, রাজ্য সরকার বর্তমানে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান তৈরিতে উদ্যোগী। তাই দ্রুত প্রকল্পটির বাকি কাজ শেষ করার ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী। সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপে প্রকল্পটি চালু হলে কালিয়াগঞ্জের সর্ষের তেল শিল্পে নতুন জোয়ার আসতে পারে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

১৮ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর এখন কালিয়াগঞ্জবাসীর একটাই প্রশ্ন—আর কতদিন? কবে চালু হবে কোটি কোটি টাকার এই স্বপ্নের সর্ষের তেল ক্লাস্টার?