ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা কালিয়াগঞ্জে! সাংসদ থেকে পৌরপতি—উন্নয়নের নতুন রূপরেখা নিয়ে দায়িত্ব নিলেন কার্তিক চন্দ্র পাল

  তন্ময় চক্রবর্তী উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জে শুক্রবার এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী থাকল সাধারণ মানুষ। রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর এই প্রথম কোনও পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পৌরপতির দায়িত্ব গ্রহণ করলেন একজন সাংসদ। রায়গঞ্জ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ কার্তিক চন্দ্র পাল আনুষ্ঠানিকভাবে কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান তথা পৌরপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহল, প্রশাসনিক স্তর এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও আগ্রহের সৃষ্টি হয়।রাজ্যের নগর উন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক দপ্তরের জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কার্তিক চন্দ্র পালকে কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করা হয়।

 

সেই নির্দেশ অনুসারে শুক্রবার সকাল ১১টায় পৌরসভা ভবনে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে রায়গঞ্জ মহকুমা শাসক তন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় নবনিযুক্ত পৌরপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান।শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে সকাল থেকেই পৌরসভা প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবের আবহ। সাধারণ মানুষ, বিজেপি কর্মী-সমর্থক, বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

 

উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের দুই মন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী ও বিরাজ বিশ্বাস।কালিয়াগঞ্জ এর বিধায়ক উৎপল মহারাজ এবং হেমতাবাদের বিধায়ক হরিপদ বর্মন এবং বিজেপির জেলা সভাপতি নিমাই কবিরাজ।  এছাড়াও জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধি এবং বিজেপির বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্ব অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।দায়িত্ব গ্রহণের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কার্তিক চন্দ্র পাল বলেন, “জনগণের আশীর্বাদেই আমি আবার কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। তবে এই দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন সময়ে নিতে হচ্ছে। পৌরসভার আর্থিক অবস্থা খুবই সংকটজনক। একদিকে বিপুল ঋণের বোঝা, অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পেনশন বকেয়া রয়েছে। একইসঙ্গে নাগরিক পরিষেবার ক্ষেত্রেও একাধিক সমস্যা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষের সহযোগিতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়।”তিনি আরও বলেন, “আমাদের দল এবং নেতৃত্ব আমার উপর আস্থা রেখে এই দায়িত্ব দিয়েছে। আমি কালিয়াগঞ্জবাসীর কাছে আবেদন করব, সকলে মিলেই এই পৌরসভাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এই পৌরসভা কোনও রাজনৈতিক দলের নয়, এটি হবে মানুষের পৌরসভা। মানুষের প্রয়োজন ও স্বার্থকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হবে।”পৌর এলাকার উন্নয়ন প্রসঙ্গে কার্তিক চন্দ্র পাল জানান, বহু প্রতীক্ষিত কালিয়াগঞ্জ স্টেডিয়ামের কাজ দ্রুত সম্পূর্ণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “আমি যখন পৌরপতি ছিলাম, তখন এই স্টেডিয়ামের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু অর্থাভাবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ প্রায় থমকে রয়েছে। সেই কারণেই আমার সাংসদ তহবিল থেকে প্রায় ৯০ লক্ষ টাকা অনুমোদন করেছি, যাতে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা যায়। কালিয়াগঞ্জের যুব সমাজ ও ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য আধুনিক স্টেডিয়াম গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।”এছাড়াও তিনি কালিয়াগঞ্জে একটি আধুনিক সুইমিং পুল নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন। তাঁর কথায়, “মানুষের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই সুইমিং পুল তৈরি করা হবে। শুধু নামকাওয়াস্তে কোনও প্রকল্প নয়, এমন একটি আধুনিক সুইমিং পুল তৈরি হবে যেখানে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—উভয়ের জন্য পৃথক ব্যবস্থা থাকবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রীড়া ও স্বাস্থ্যচর্চার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”নতুন পৌরপতির বক্তব্যে স্পষ্ট, কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার আর্থিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি নাগরিক পরিষেবার উন্নয়ন, ক্রীড়া পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং দীর্ঘদিনের অসমাপ্ত প্রকল্পগুলিকে দ্রুত সম্পূর্ণ করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, একজন সাংসদের সরাসরি পৌরসভার নেতৃত্বে আসা উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন গতি আনতে পারে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের প্রকল্পগুলির মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নের সম্ভাবনাও বেড়ে যাবে।অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছিল আশাবাদের সুর। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে কালিয়াগঞ্জ পৌরসভা এবার নতুন পথে এগোবে। নাগরিক পরিষেবা, রাস্তা, পানীয় জল, নিকাশি ব্যবস্থা, ক্রীড়া ও সামাজিক পরিকাঠামো—সব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটবে বলে তাঁদের প্রত্যাশা।কালিয়াগঞ্জ পৌরসভার ইতিহাসে শুক্রবারের দিনটি তাই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল। এখন নজর আগামী দিনের দিকে—নতুন পৌরপতি কার্তিক চন্দ্র পালের নেতৃত্বে কত দ্রুত এবং কতটা সফলভাবে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ পায়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সমগ্র কালিয়াগঞ্জ।