পরিবর্তন যাত্রার রথে কালিয়াগঞ্জে উচ্ছ্বাস, তবে বিধায়ক সৌমেন রায়কে ঘিরে বিজেপির অন্দরে গোষ্ঠী দ্বন্দ্বে নতুন জল্পনা
তন্ময় চক্রবর্তী :- দুয়ারে কড়া নাড়ছে বিধানসভা নির্বাচন। আর এই সময়কে সামনে রেখে রাজ্যের প্রতিটি রাজনৈতিক দলই ভোটারদের মন জয় করতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। সেই প্রেক্ষাপটে এবার আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ময়দানে নেমেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। শাসক দলকে কড়া চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সারা রাজ্য জুড়ে শুরু হয়েছে বিজেপির বহুল আলোচিত “পরিবর্তন যাত্রা”।সম্প্রতি ইসলামপুর থেকে শুরু হওয়া এই পরিবর্তন যাত্রার রথ শুক্রবার রায়গঞ্জ ও হেমতাবাদ হয়ে কালিয়াগঞ্জে পৌঁছাতেই বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক উচ্ছ্বাস। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা অগণিত মানুষ হাত নেড়ে অভিবাদন জানান রথে উপস্থিত বিজেপি নেতাদের।রথের উপর দাঁড়িয়ে কখনও রায়গঞ্জের সাংসদ কার্তিক চন্দ্র পাল, কখনও বিজেপির প্রাক্তন জেলা সভাপতি শঙ্কর চক্রবর্তী, আবার কখনও উত্তর মালদা কেন্দ্রের সাংসদ খগেন মুর্মু সাধারণ মানুষকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান।

অনেক জায়গায় নেতাদের পক্ষ থেকে গাঁদা ফুল ছিটিয়ে সাধারণ মানুষকে অভিবাদন জানাতেও দেখা যায়।এই পরিবর্তন যাত্রাকে ঘিরে কালিয়াগঞ্জে বিজেপির মহিলা মোর্চার কর্মীদের মধ্যেও ছিল বিশেষ উৎসাহ। হাতে “পরিবর্তন” লেখা ব্যানার নিয়ে সারিবদ্ধভাবে রথের সঙ্গে স্লোগান দিতে দিতে শহর পরিক্রমা করেন তারা। পুরো কর্মসূচিতে কর্মী-সমর্থকদের মুখে ছিল পরিবর্তনের স্লোগান এবং আসন্ন নির্বাচনে জয়ের প্রত্যাশা।তবে রাজনৈতিক এই উচ্ছ্বাসের মাঝেই সামনে এসেছে বিজেপির অন্দরমহলের একটি স্পর্শকাতর বিষয়। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে উত্তর দিনাজপুর জেলার দুটি আসন বিজেপি দখল করেছিল। তার মধ্যে একটি ছিল কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র, যেখান থেকে বিজেপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছিলেন সৌমেন রায়। কিন্তু নির্বাচনের কিছুদিন পরেই তিনি দলবদল করে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। পরে আবার বিজেপিতে ফিরে আসেন।এই দলবদলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কালিয়াগঞ্জ বিজেপির অন্দরে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের অস্বস্তি এবং বিভাজনের কথা শোনা যায়। তারই প্রতিফলন যেন আবার সামনে এল পরিবর্তন যাত্রার কর্মসূচিতে। শুক্রবারের রথযাত্রায় বিজেপির বহু শীর্ষ নেতা উপস্থিত থাকলেও সেখানে দেখা যায়নি কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক সৌমেন রায়কে।দলের একাংশের কর্মীদের দাবি, নির্বাচনের আগে বিজেপির উচিত ঐক্যের বার্তা দেওয়া। কিন্তু বিধায়ককে দূরে রেখে কর্মসূচি করলে তাতে কর্মীদের মধ্যেই বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। আবার দলের অন্য একটি অংশের মত, বর্তমান বিধায়ককে সামনে আনা হলে দলের ক্ষতিই হতে পারে, কারণ তার দলবদলের ঘটনায় অনেক কর্মী এখনও অসন্তুষ্ট।তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সৌমেন রায় আপাতত ময়দান ছাড়ার পাত্র নন। তিনি নিয়মিত কালিয়াগঞ্জ বিধানসভার বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এবং নীরবে নিজের সংগঠনও মজবুত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।এদিকে এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক জল্পনাও শুরু হয়েছে। অনেকের মতে, বিজেপি নেতৃত্ব হয়তো ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণ মাথায় রেখে কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে অন্য কোনও স্থানীয় নেতাকে সামনে আনতে চাইছে। সেই কারণেই কি বর্তমান বিধায়ককে বড় মঞ্চে দেখা যাচ্ছে না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক মহলে।উল্লেখ্য, সম্প্রতি বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ কালিয়াগঞ্জের নজমু নাট্য নিকেতনে বিজেপি কর্মীদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। সেখানেও অনুপস্থিত ছিলেন বিধায়ক সৌমেন রায়, যা নিয়ে দলের অন্দরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তন যাত্রা একদিকে যেমন বিজেপির সংগঠনকে চাঙা করতে সাহায্য করছে, তেমনি কালিয়াগঞ্জে দলের অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী কোন্দলও আবার প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে।এখন দেখার বিষয়, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতৃত্ব কীভাবে এই অভ্যন্তরীণ মতভেদ সামাল দেয় এবং কালিয়াগঞ্জের রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়। তবে সব বিতর্কের মাঝেও পরিবর্তন যাত্রাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে কৌতূহল ও উৎসাহ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

