তরঙ্গপুরের ঘোষ বাড়ির দুর্গা পূজা ষষ্ঠীর আগে বোধনে টিন বাজিয়ে পূজার শুরু আজও
তপন চক্রবর্তী,কালিয়াগঞ্জ,উত্তর দিনাজপুর ১০ সেপ্টেম্বর:১৯৪৭ সাল— এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষ পেল স্বাধীনতার অমূল্য স্বাদ। কিন্তু দেশভাগের ক্ষত ততদিনে রক্তাক্ত করে তুলেছে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়। সীমান্তের এপারে-ওপারে অনিশ্চয়তার ঘনঘটা, উদ্বাস্তু জীবনের আর্তনাদ আর ভবিষ্যতের অজানা ভয়— এ সবের মাঝেই দাঁড়িয়েছিল কালিয়াগঞ্জ।তৎকালীন দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত কালিয়াগঞ্জবাসীর মনে তখন স্বাধীনতার আনন্দের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল এক অস্থিরতা। প্রচার হচ্ছিল— কালিয়াগঞ্জ নাকি নবগঠিত পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে! এই গুজবেই গ্রামজুড়ে নেমে আসে আতঙ্কের ছায়া। চারিদিকে অনিশ্চয়তা— যদি কালিয়াগঞ্জ পূর্ব পাকিস্তানে চলে যায়, তবে কেমন হবে এখানকার মানুষের ভবিষ্যৎ? এই প্রশ্নে বুক কাঁপছিল সবার।এমনই এক সময় তরঙ্গপুর গ্রামের স্বর্গীয় সতীশচন্দ্র ঘোষ তাঁর মনের সমস্ত বিশ্বাস মিশিয়ে মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন—“হে মা, যদি কালিয়াগঞ্জ ভারতের অংশ হিসেবেই থেকে যায়, তবে আমি তোমার পূজোর সূচনা করব। সারাজীবন ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে এই পূজা চালিয়ে যাব।”মায়ের আশীর্বাদ হোক কিংবা ভাগ্যের লিখন—পরবর্তীতে কালিয়াগঞ্জ ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়।

প্রতিজ্ঞার মর্যাদা রক্ষার্থে সতীশচন্দ্র ঘোষ ১৯৫১ সালে দুর্গাপূজার সূচনা করেন। সেই শুভসূচনা থেকেই আজ পর্যন্ত প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অটল বিশ্বাসে ও নিষ্ঠায় অব্যাহত রয়েছে এই পূজো।তখনকার তরঙ্গপুর কিন্তু আজকের মতো জনবসতি পূর্ণ গ্রাম ছিল না। চারিদিক ছিল ঘন অরণ্যে ঢাকা। চারপাশে বাঘ, ভালুক, শিয়াল, সাপ— হিংস্র পশুপাখির উৎপাত ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। পূজার আগে গ্রামবাসী একসঙ্গে জঙ্গল পরিষ্কার করত। আর পশুদের ভয় দূর করতে তারা টিন বাজিয়ে আওয়াজ তুলত। এভাবেই তৈরি হয়েছিল পূজোর এক অভিনব আচার। আজও সেই প্রথা অটুট— ষষ্ঠীর বোধনের আগে টিন বাজিয়েই শুরু হয় তরঙ্গপুর ঘোষবাড়ির দুর্গাপূজো।এই টিন বাজানো শুধু শব্দ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অন্যরকম আবেগ। যেন সেই শব্দই ঘোষণা করে— মা দুর্গা এসেছেন, অশুভ শক্তি দূরে সরে যাক, গ্রামে আসুক শান্তি ও মঙ্গল। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই রীতি দেখে এসেছে, পালন করেছে, আর গর্ব করে সংরক্ষণ করেছে।আশ্বিন মাসের রথের দিনে দেবীর পূজার সূচনা হয় বিশেষ এক আচার দিয়ে। সেই দিন কাঠামোর উপর প্রথম মাটি দেওয়া হয়, যা পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। ধীরে ধীরে সেই কাঠামোই পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় এবং স্থানীয় মন্দিরে একক কাঠামোর দেবী দুর্গার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এখানে প্রতিবারই একই রকম আদলে প্রতিমা নির্মিত হয়, তাই বছরের পর বছর ধরে দেবীর রূপে তেমন কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না।এই পূজার সঙ্গে একসময় গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি বড় অংশ জড়িয়ে ছিল। বিশেষত যাত্রাগান ছিল এই পূজার অন্যতম আকর্ষণ। গ্রামের ছেলেরা সকলে মিলে যাত্রাদলে অংশ নিতেন, আর সেই যাত্রা গ্রামজুড়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করত। দিন-রাতের পরিশ্রম, অনুশীলন আর অভিনয়ের মাধ্যমে তারা পূজার আনন্দকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তুলতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই যাত্রাগান ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে, আজ আর আগের মতো অনুষ্ঠিত হয় না।তবু এই পূজার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আজও অটুট রয়েছে—এখানে কোনো পশুবলির প্রথা নেই। দেবীর আরাধনা হয় কেবল ভক্তি, নিবেদন ও ভোগের মাধ্যমে। বিশেষ করে অষ্টমীর দিনে দেবীকে লুচি, তরকারি ও নানারকম ভোগ নিবেদন করা হয়। পূজা শেষে প্রতিমা বিসর্জন না দিয়ে সারা বছর মন্দিরেই রাখা হয়।আজ এত বছর পরও তরঙ্গপুর ঘোষবাড়ির পূজা শুধু দেবীর আরাধনা নয়, এটি এক ঐতিহাসিক প্রতীক। স্বাধীনতার প্রথম দিনের দুশ্চিন্তা, এক ভক্তের মানত, গ্রামবাসীর ঐক্য আর দেবী দুর্গার কৃপা— সবকিছু মিলে এই পূজা হয়ে উঠেছে কালিয়াগঞ্জের গর্ব।





