সূর্যের তেজে জিতল ভারত
আরব সাগরের পাড়ে সূর্যোদয়—কিন্তু তা রাতের আকাশেই। কাপ অভিযানের শুরুতেই গতবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত কার্যত বিপর্যস্ত। আমেরিকার বিরুদ্ধে ম্যাচে এমন এক সময় এসেছিল, যখন মনে হচ্ছিল পচা শামুকে পা কাটার মতো অবস্থা টিম ইন্ডিয়ার। নেটদুনিয়ায় তখন ব্যঙ্গের ঝড়— “শুল্ক বাঁচাতে ট্রাম্পকে খুশি করাই কি মোদির ভারতের লক্ষ্য?”এই কোণঠাসা পরিস্থিতিতেই জ্বলে উঠলেন অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। একাই কাঁধে তুলে নিলেন দলের ভার। তাঁর বীরত্বের লড়াই অন্ধকারে জ্বালাল আশার আলো। শেষ পর্যন্ত ২৯ রানে ভারতের জয়ের নায়ক ‘স্কাই’। ৪৯ বলে অপরাজিত ৮৪ রানের ইনিংসে ফেভারিটদের চোখে-মুখে জল এনে দিলেন তিনি।

নোরা ফাতেহির নাচ, ঋষভ রিখিরাম শর্মার সেতার ও শিবমণির ড্রামে বর্ণময় উদ্বোধনের পর ভারতের শুরুটা ছিল রীতিমতো ফ্যাকাশে। অভিষেক শর্মা ‘গোল্ডেন ডাক’। ঈশান কিষান (১৬ বলে ২০) ছিলেন ছন্দহীন। তিলক ভার্মা (১৬ বলে ২৫) শুরুটা ভালো করলেও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। পাওয়ার প্লের মধ্যেই পড়ে যায় চার উইকেট। এরপর শিবম দুবে-ও ‘গোল্ডেন ডাক’। স্কোর তখন ৪৬-৪।রিঙ্কু সিং (১৪ বলে ৬) ও হার্দিক পান্ডিয়া (৬ বলে ৫) অহেতুক আগ্রাসনে উইকেট বিলিয়ে দেন।

পরিস্থিতি বুঝে খেলার বদলে ইংল্যান্ডের ‘বাজবল’-এর নকল করতে গিয়ে বড়লোকের বাউন্ডুলে ছেলের মতো ধুমধাড়াক্কা আগ্রাসন দেখাতে গিয়ে বিপদ বাড়ায় ভারত। বিশেষ করে হালফ্যাশন হেয়ারস্টাইল করা হার্দিকের স্পিনারকে ওড়াতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়।১২.৪ ওভারে স্কোর ৭৭-৬। ওয়াংখেড়েতে তখন পিনপতনের নৈঃশব্দ্য। ডাগ-আউটে চাপা টেনশন। কোচের মুখ গুরুগম্ভীর। নিখুঁত লাইন-লেংথ, গতির হেরফের ও বুদ্ধিদীপ্ত ফিল্ডিংয়ে আমেরিকা তখন চালকের আসনে—ট্রাম্পসুলভ উদ্ধত হাবভাব স্পষ্ট।সেই আত্মবিশ্বাসই চুরমার করে দেন সূর্যকুমার যাদব। অধিনায়কোচিত ইনিংসে দেড়শোর গণ্ডি পার করিয়ে দেন তিনি। কেন তিনি ‘৩৬০ ডিগ্রি ব্যাটার’, তা হাড়ে হাড়ে টের পায় বিপক্ষ। ১০টি চার ও ৪টি ছক্কায় সাজানো তাঁর ইনিংস দলকে ভেন্টিলেশন থেকে টেনে বাইরে আনে।

অক্ষর প্যাটেল (১৪) ও অর্শদীপ সিং (৪) দ্রুত ফিরলেও একা কুম্ভ হয়ে ইনিংস সামলান সূর্য।বিশেষ করে সৌরভ নেত্রাভালকরের উপর ছিলেন সবচেয়ে নির্দয়। বাঁ-হাতি পেসারের চার ওভারে ওঠে ৬৫ রান—টি-২০ বিশ্বকাপে যা রেকর্ড। এই ফরম্যাটে সূর্যের ২৫তম পঞ্চাশ তাই আলাদা গুরুত্ব পেল। ভারত পৌঁছায় ১৬১ রানে।১৬২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অঘটনের জন্য ভালো শুরু দরকার ছিল আমেরিকার।
কিন্তু চার ওভারের মধ্যেই তিন উইকেট হারিয়ে খোলসে ঢুকে পড়ে তারা। হর্ষিত রানার চোটে স্কোয়াডে ঢোকা মহম্মদ সিরাজ দুই ওপেনারকেই ফেরান। অধিনায়ক মোনাংক প্যাটেল (০) শিকার হন অর্শদীপের। সঞ্জয় কৃষ্ণমূর্তি (৩৭) ও মিলিন্দ কুমার (৩৪) লড়াই চালালেও তা জয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না।স্পিনে ভাঙন ধরান অক্ষর প্যাটেল (২ উইকেট), বরুণ চক্রবর্তীর ঝুলিতেও আসে একটি।

আমেরিকা থামে ১৩২-৮-এ। ভারতের সফলতম বোলার সিরাজ (৩-২৯)।জয় এল, কিন্তু প্রশ্নও রইল। লাগামহীন আগ্রাসনে রাশ টানার প্রয়োজনীয়তা আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল এই ম্যাচ। এদিন সূর্যকুমার পরিত্রাতা ছিলেন অনভিজ্ঞ আমেরিকার বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রতিদিন তো আর একা সূর্য উঠবে না। আত্মতুষ্টির খেসারত যে তখন দিতে হতে পারে—সে বার্তাও দিয়ে গেল এই জয়।সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ভারত ১৬১-৯ (সূর্যকুমার যাদব অপরাজিত ৮৪, তিলক ভার্মা ২৫, ঈশান কিষান ২০; স্কালকউইক ৪-২৫, হরমিত ২-২৬)
আমেরিকা ১৩২-৮ (সঞ্জয় কৃষ্ণমূর্তি ৩৭, শুভম ৩৭, মিলিন্দ কুমার ৩৪; সিরাজ ৩-২৯)
ফল: ভারত জয়ী ২৯ রানে।



