কালিয়াগঞ্জে ভোটের বাদ্যি: উন্নয়ন বনাম দুর্নীতির লড়াইয়ে কি ফের ‘পদ্ম’ হাতেই ভরসা রাখবেন সৌমেন রায়?
তন্ময় চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ: ভোটের এখনো দেরি, কিন্তু উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জ বিধানসভা জুড়ে সাজ সাজ রব। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে শাসক ও বিরোধী—উভয় পক্ষই। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস যেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমুখী প্রকল্প ও উন্নয়নের ‘পাঁচালি’ নিয়ে গ্রামে গঞ্জে পৌঁছাচ্ছে, অন্যদিকে বিজেপিও পাল্টা সুর চড়াচ্ছে ‘সংকল্প সভা’র মাধ্যমে। সম্প্রতি কালিয়াগঞ্জের ভাণ্ডার গ্রাম পঞ্চায়েতের রাতনে বিজেপির একটি ‘পরিবর্তন সভা’ ঘিরে রাজনৈতিক পারদ তুঙ্গে উঠেছে। সেখানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক সৌমেন রায়। সভায় উপস্থিত উপচে পড়া ভিড়ের সামনে তিনি একদিকে যেমন মোদী সরকারের সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরেন, তেমনই তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে সরব হন।

বিধায়কের এই সক্রিয়তা দেখে রাজনৈতিক মহলের ধারণা, তিনি এখন থেকেই নিজের জমি শক্ত করতে মরিয়া।রাজনৈতিক সমীকরণ ও ‘টিকিট’ বিতর্ক কালিয়াগঞ্জের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক অন্দরমহলে এখন একটাই প্রশ্ন—আগামী নির্বাচনে কি ফের বিজেপির টিকিট পাচ্ছেন সৌমেন রায়? এই গুঞ্জনের নেপথ্যে রয়েছে তাঁর রাজনৈতিক অতীত। ২০২১ সালে বিজেপির টিকিটে জিতলেও মাঝে কিছুদিন তিনি ঘাসফুল শিবিরের ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন, তবে চব্বিশের লোকসভা ভোটের আগেই তিনি পুনরায় আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পদ্ম’ শিবিরে ফিরে আসেন।বর্তমানে তিনি যেভাবে এলাকায় এলাকায় সভা করছেন এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্পের প্রচার করছেন, তাতে একাংশ মনে করছে দলের ওপর তলার নেক নজরে রয়েছেন তিনি। তবে বিজেপির অন্দরে প্রার্থী পদ নিয়ে লড়াই থাকে সবসময়ই, তাই পুরনো ও নতুনের দ্বন্দ্বে শেষ হাসি কে হাসবেন, তা নিয়ে গুঞ্জন থামছে না।ময়দানে যুযুধান দুই পক্ষ ।

তৃণমূলের কৌশল: কালিয়াগঞ্জের গ্রামে গঞ্জে তৃণমূল নেতারা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ থেকে শুরু করে বার্ধক্য ভাতার মতো রাজ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কাজগুলোকে হাতিয়ার করছেন। তাঁদের লক্ষ্য, উন্নয়নের নিরিখে মানুষের মন জয় করা।
বিজেপির পাল্টা চাল: বিধায়ক সৌমেন রায়ের নেতৃত্বে বিজেপি কর্মীরা কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্যের পাশাপাশি রাজ্যের নিয়োগ দুর্নীতি ও পঞ্চায়েত স্তরের দুর্নীতির ইস্যুগুলো মানুষের সামনে রাখছেন।এদিকে কালিয়াগঞ্জ তফশিলি জাতি সংরক্ষিত আসন হওয়ায় এখানে রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ক একটি বড় ফ্যাক্টর। সৌমেন রায় যেভাবে জনসংযোগ বাড়াচ্ছেন, তাতে পরিষ্কার যে তিনি নিজের ইমেজকে কাজে লাগিয়ে দিল্লি ও কলকাতার নেতৃত্বের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে চাইছেন। তবে টিকিট পাওয়া বা না পাওয়া অনেকটা নির্ভর করবে দলের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা এবং আরএসএস-এর রিপোর্টের ওপর।

সৌমেন রায়ের ‘পরিবর্তন সভা’ ঘিরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে যেমন উৎসাহ দেখা গেছে, তেমনই রয়েছে নানা জিজ্ঞাসা। কালিয়াগঞ্জের চা-চক্র থেকে শুরু করে বাজারের আড্ডায় সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ায় উঠে আসছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট:
১. কাজের মূল্যায়ন ও দলবদল নিয়ে প্রশ্ন: কালিয়াগঞ্জ শহরের এক প্রবীণ বাসিন্দার মতে, “বিধায়ক হিসেবে সৌমেন বাবুকে এলাকার মানুষ কাছে পায়। কিন্তু ওনার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সাধারণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে কিছুটা ধন্দ রয়েছে। একবার বিজেপি থেকে তৃণমূল, আবার বিজেপি—সাধারণ মানুষ এখন ব্যক্তির চেয়ে দলের প্রতি আনুগত্য বেশি দেখতে চায়।”
২. নতুন প্রার্থী নিয়ে জল্পনা: বিজেপির একনিষ্ঠ কর্মী বলে পরিচিত এক যুবকের স্পষ্ট বক্তব্য, “সৌমেন বাবু এখন বিজেপিতেই আছেন এবং কাজ করছেন। কিন্তু টিকিট কে পাবে তা তো দল ঠিক করবে। কালিয়াগঞ্জের সাধারণ মানুষ এমন কাউকে চায় যে মাঝপথে দল পাল্টাবে না। প্রার্থী পদ নিয়ে অন্দরে যে গুঞ্জন চলছে, তা ভোটের আগে স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।”
৩. রাজবংশী ভোটব্যাঙ্কের সমীকরণ: গ্রামাঞ্চলের এক কৃষক ভোটার জানালেন, “কালিয়াগঞ্জে রাজবংশী আবেগ একটা বড় বিষয়। কেন্দ্রীয় সরকার কী করেছে আর রাজ্য সরকার কী দিচ্ছে—দুটোর তুলনা করেই আমরা ভোট দেব।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে যে, ভোটাররা এখন শুধুমাত্র প্রচারের চমকে নয়, বরং রাজনৈতিক স্থায়িত্ব এবং হাতের কাছে বিধায়ককে পাওয়া—এই দুই বিষয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। সৌমেন রায়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজের রাজনৈতিক বিশ্বস্ততা বজায় রেখে দলের অন্দরের দ্বন্দ্ব কাটিয়ে ওঠা।




![]()
